কোরবানির ঈদ সামনে রেখে রাজধানীর কামারপল্লীগুলো এখন ব্যস্ততম সময় পার করছে। কারওয়ান বাজার, পুরান ঢাকার কাপ্তান বাজার ও নয়াবাজারজুড়ে সারাদিন ভেসে আসছে লোহা পেটানোর টুংটাং শব্দ। কোথাও দগদগে লাল লোহা; হাতুড়ির আঘাতে আকার পাচ্ছে দা কিংবা বঁটির, কোথাও আবার শান দেওয়া হচ্ছে ছুরি-চাকু।
রাজধানীর কারওয়ান বাজারে গত ৯ বছর ধরে দা-বটি-ছুরি তৈরির কাজ করছেন কর্মকার আরিফুল হক। অন্য সময়ের তুলনায় এখন তার ব্যস্ততা অনেক বেশি। জলন্ত লোহা ধরে আছেন আরিফুল। দুই পাশে মারুফ হাসান ও কামাল সরকার ভারী হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে লোহাকে দিচ্ছেন প্রয়োজনীয় আকার। দম ফেলারও যেন সময় নেই। কারণ কয়েকদিন পরই কোরবানির ঈদ। আর এই ঈদ ঘিরেই তাদের বছরের বড় বেচাকেনা।
আরিফুল হকের দোকানের মতো আশপাশের দোকানগুলোতেও একই দৃশ্য। কোথাও ছুরি কিংবা বঁটি শান দেওয়া হচ্ছে, কোথাও কয়লার আগুনে হাওয়া দিয়ে লোহা গরম করা হচ্ছে। ব্যস্ততায় কারও যেন এক মুহূর্ত অবসর নেই।
কাজের ফাঁকে বাসসের সঙ্গে কথা হয় আরিফুল হকের। তিনি জানান, কোরবানির ঈদই মূলত তাদের ব্যবসার মৌসুম। এই সময় ঈদের রাত পর্যন্ত কাজ করতে হয়। ভোররাত থেকে শুরু হয়ে কাজ চলে রাত ১০টা-১১টা পর্যন্ত। প্রচুর অর্ডারের সরঞ্জাম তৈরি ও ডেলিভারি দিতে হয়। পাশাপাশি দোকানে বিক্রির জন্যও প্রস্তুত রাখতে হয় নানা ধরনের দা, বটি ও ছুরি। প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার থেকে ১২০০টি বিভিন্ন ধরনের সরঞ্জাম তৈরি করতে হচ্ছে।
কারওয়ান বাজারের কর্মকার মার্কেট ঘুরে দেখা যায়, আরিফুলের মতো অন্য কর্মকাররাও একই ব্যস্ত সময় পার করছেন। কেউ দা-বটি বানাচ্ছেন, কেউ গ্রাহকদের ছুরি-চাকু দেখাচ্ছেন। কোরবানিকে সামনে রেখে দোকানগুলোতে ক্রেতাদেরও উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে।
সরেজমিনে কারওয়ান বাজার, কাপ্তান বাজার ও নয়াবাজার ঘুরে দেখা যায়, কর্মকারদের দোকানে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। ব্যক্তি থেকে শুরু করে পেশাদার কসাই; সবাই কোরবানির সরঞ্জাম কিনতে ভিড় করছেন। কেউ দা-বটি কিনছেন, কেউ জবাইয়ের ছুরি, কেউ আবার একাধিক সেট সরঞ্জাম কিনে রাখছেন।
কোরবানিকে কেন্দ্র করে কসাইদের চাহিদাও বেড়েছে। তাই অনেকেই আগে থেকেই প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কিনে রাখছেন। দোকানিরাও গ্রাহকদের বিভিন্ন ধরনের দা-বটি-ছুরি দেখিয়ে মান ও দামের বিষয়ে বোঝাচ্ছেন।
কারওয়ান বাজারে কোরবানির ছুরি কিনতে আসা একটি ব্যাংকের কর্মকর্তা আশরাফুল হক বাসসকে বলেন, লক্ষ্মীপুরে গ্রামের বাড়িতে কোরবানি হবে। এজন্য ঢাকা থেকেই পশু কাটার সরঞ্জাম কিনেছেন। দুই বছর আগেও এখান থেকে সরঞ্জাম নিয়েছিলাম। এখানকার লোহার তৈরি সরঞ্জাম ভালো মানের, মাংস কাটতেও সুবিধা হয় এবং টেকসই। তাই এখান থেকে কেনা।
কারওয়ান বাজারের এম এস আল-আমিন হার্ডওয়ারের মালিক আল আমিন বাসসকে বলেন, ঈদকে ঘিরে কেনাবেচা জমে উঠেছে। এত চাপ যে পানি খাওয়ারও সময় পাওয়া যায় না। মাঝরাতে বাসায় ফিরতে হয়, আবার সকালে দোকানে আসতে হয়। এবার বেশি বিক্রির আশায় প্রায় ৬ লাখ টাকার সরঞ্জাম দোকানে তুলেছেন, যা গতবারের চেয়েও বেশি। চাঁদ রাত পর্যন্ত বিক্রি চললে পুরো চালান শেষ হয়ে যাবে।
দামের বিষয়ে আল আমিন বলেন, এসব সরঞ্জাম লোহার তৈরি হওয়ায় দাম কেজি হিসাবে নির্ধারণ করা হয়। আকারভেদে বটি বিক্রি হচ্ছে ৬০০ থেকে ১ হাজার টাকায়। দা ৩৫০ থেকে ৫০০ টাকা, সাধারণ ছুরি ১৫০ থেকে ২৫০ টাকা এবং জবাইয়ের ছুরি ৯০০ থেকে দেড় হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
এছাড়া, হাসুয়ার দাম ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা। ৮ ও ১২ পিসের চপার সেটও বিক্রি হচ্ছে। ৮ পিসের সেটের দাম সাড়ে ৩ হাজার এবং ১২ পিসের সেটের দাম প্রায় ৪ হাজার টাকা।
আল আমিন আরও জানান, অনলাইনেও ভালো বিক্রি হচ্ছে। গ্রাহকরা সরঞ্জাম দেখে অর্ডার দিচ্ছেন। পরে তা তৈরি করে হোম ডেলিভারিও দেওয়া হচ্ছে।
শুধু নতুন সরঞ্জাম বিক্রিই নয়, পুরোনো দা-বটি-চাকু শান দিতেও ব্যস্ত সময় পার করছেন কর্মকাররা। অনেকে পুরোনো সরঞ্জাম ধার করাতে নিয়ে আসছেন। আকারভেদে শান দেওয়ার খরচ পড়ছে ৫০ থেকে ২০০ টাকা।
কাপ্তান বাজারে ছুরি কিনতে আসা এনামুল হক বাসসকে বলেন, নিজের কোরবানির পাশাপাশি অন্যের পশুও কাটতে হবে। তাই জবাইয়ের ছুরি, চামড়া ছাড়ানোর চাকু ও দা কিনেছেন। চীনা পণ্যের তুলনায় লোহার তৈরি জিনিসের দাম এবার কিছুটা বেশি। তবে এগুলো অনেক বেশি মজবুত ও টেকসই।
কর্মকারদের দোকানের পাশেই বিক্রি হচ্ছে কোরবানির কাজে ব্যবহৃত বাঁশের চাটাই ও তেঁতুল কাঠের পাটাতন ‘খাইট্টা’। বিক্রেতারা ক্রেতা দেখলেই ডাকছেন। আকারভেদে চাটাই বিক্রি হচ্ছে ২০০ থেকে ৫০০ টাকায় এবং প্রতি পিস খাইট্টা ৩০০ থেকে ৮০০ টাকায়।
কাঠ ও চাটাই বিক্রেতা আব্দুল মানিক বলেন, এখন অনেকেই পলিথিন ব্যবহার করায় চাটাইয়ের চাহিদা কমেছে। তবে এবার আগের বছরের তুলনায় বিক্রি কিছুটা বেশি। খাইট্টার বিক্রিও ভালো হচ্ছে।
কারওয়ান বাজার কর্মকার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ হারুন বাসসকে বলেন, ছুরি-চাকুর জন্য এই কর্মকার বাজারের আলাদা নামডাক রয়েছে। কারণ এখানে অরিজিনাল লোহা দিয়ে সরঞ্জাম তৈরি করা হয়। ঢাকার বাইরে থেকেও ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ এখানে সরঞ্জাম কিনতে আসেন। অনেকে আবার অনলাইনে অর্ডার দিয়ে ছুরি-চাকু তৈরি করাচ্ছেন। ঈদকেন্দ্রিক বেচাকেনা এখনো পুরোপুরি শুরু হয়নি। তবে গতবারের তুলনায় এবার প্রত্যেক কর্মকারই বেশি বিনিয়োগ করেছেন। বিক্রিও বেশি হবে বলে আশা করছেন তারা।








