• ঢাকা, বাংলাদেশ সোমবার, ০৪ মে ২০২৬, ১১:১০ অপরাহ্ন
  • [কনভাটার]
নোটিশ
সারাদেশের জেলা ও উপজেলায় সংবাদকর্মী আবশ্যক। নিজেকে যোগ্য মনে করলে এখনই যোগাযোগ করুন Mob: 01778840333, Email: m.r.01778840333@gmail.com

ঢাকার বায়ুদূষণ ভয়াবহ

sagar crime reporter / ৩৪ জন দেখেছে
আপডেট : সোমবার, ২ মার্চ, ২০২৬

ঢাকার বায়ুদূষণ ভয়াবহ

 

shaplanews.com

 ০২ মার্চ ২০২৬, ১২:০৬

 

বায়ুদূষণে ঢাকা বিপদসীমা অতিক্রম করেছে অনেক আগেই। বিগত কয়েক বছর যাবত বায়ুদূষণে ঢাকাবাসী মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে আছে। অন্যান্য দেশের রাজধানীর দিকে তাকালে এবং জরিপ করলে সহজভাবে বোঝা যায়, ঢাকার অবস্থা কতটা খারাপ। বিষয়টি লজ্জাজনক এবং হৃদয়বিদারকও বটে। তাই আর সময় ক্ষেপণ করা যায় না। ১১ জানুয়ারি ২০২৬ বিশ্বের দূষিত বায়ুর শহরের তালিকায় ঢাকার অবস্থান এক নম্বরে উঠে আসে। ওই দিন সকাল ৮টায় একিউআই স্কোর ২৫৭ নিয়ে দূষিত বায়ুর শহরের তালিকায় ঢাকার নাম এক নম্বরে লিপিবদ্ধ হয়। পরিবেশ বিজ্ঞানীদের অভিমত, এই স্কোরটি স্বাস্থ্যের জন্য খুবই বিপদজনক। দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে ভারতের দিল্লি এবং ভিয়েতনামের হ্যানয়। তাদের দূষণ স্কোর যথাক্রমে ২২৭ এবং ২১৯। এ দুটি শহরের বায়ুর মান অস্বাস্থ্যকর। আর বাংলাদেশের বায়ুর স্কোর মান ২৫৭, যা খুবই অস্বাস্থ্যকর। দীর্ঘদিন ধরে বায়ুদূষণে ভুগছে ঢাকা। বায়ুর গুণমান সাধারণত শীতকালে অস্বাস্থ্যকর হয়ে যায় এবং বর্ষাকালে কিছুটা উন্নত হয়। ২০১৯ সালের মার্চে পরিবেশ অধিদপ্তর ও বিশ্বব্যাংকের একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ঢাকার বায়ুদূষণের ৪টি প্রধান উৎস হলো ইটভাটা, যানবাহনের ধোঁয়া, নির্মাণ সামগ্রীর ধুলো এবং মাত্রাতিরিক্ত যান ও জনজট । বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুসারে, বায়ুদূষণের ফলে স্ট্রোক, হৃদরোগ, ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ, ফুসফুসের ক্যান্সার এবং তীব্র শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণের কারণে মৃত্যুহার বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর আনুমানিক ৭০ থেকে ৭৫ লাখ মানুষ মারা যায়। এয়ার কোয়ালিটি লাইফ ইনডেক্স (একিউএলআই) ২০২৫ সালের হালনাগাদ বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশিত আয়ুর জন্য সবচেয়ে বড় বাহ্যিক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে বায়ুদূষণ। বায়ুদূষণের কারণে বাংলাদেশের মানুষের আয়ু গড়ে সাড়ে পাঁচ বছর কমেছে। বায়ুদূষণ বিভিন্ন রোগ-ব্যাধি, অ্যালার্জি থেকে শুরু এমনকি মানুষের মৃত্যুর কারণ হতে পারে; এটি প্রাণী এবং খাদ্যফসলের মতই অন্যান্য জীবন্ত প্রাণীর, প্রাকৃতিক পরিবেশ বা মানবসৃষ্ট কৃত্রিম পরিবেশের ক্ষতি করে।

স্কোর শূন্য থেকে ৫০ এর মধ্যে থাকলে বায়ুর মান ভালো বলে বিবেচিত হয়। ৫১ থেকে ১০০ হলে মাঝারি বা সহনীয় ধরা হয় বায়ুর মান। সংবেদনশীল গোষ্ঠীর জন্য অস্বাস্থ্যকর হিসেবে বিবেচিত হয় ১০১ থেকে ১৫০ স্কোর। ১৫১ থেকে ২০০ পর্যন্ত অস্বাস্থ্যকর হিসেবে বিবেচিত হয়। স্কোর ২০১ থেকে ৩০০ হলে খুবই অস্বাস্থ্যকর হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এছাড়া ৩০১-এর বেশি হলে তা দুর্যোগপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়। কেন এই বায়ু দূষণ সেদিকে এবার একটু নজর দেওয়া যাক। পুরো ঢাকা শহরকে বিগত ৫৫ বছরে অপরিকল্পিতভাবে ঢেলে সাজানো হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং আবাসন প্রকল্প নিয়মের তোয়াক্কা না করে গড়ে তোলা হয়েছে। এর ফলে ঢাকার চতুর্পার্শে¦র লক্ষ লক্ষ টন বর্জ্য-আবর্জনার স্তূপ গড়ে উঠেছে। আর এখান থেকেই বায়ু দূষিত হচ্ছে। ঢাকা শহরে পরিবহন সেক্টরে কোনো নিয়ম নীতির বালাই নেই। ঢাকা শহরে আয়তন অনুসারে যানবাহনের চাপ এতোটই বেশি, যা বিশ্বের অন্য কোনো রাজধানী শহরে দৃশ্যমান নয়। মাত্রাতিরিক্ত যানবাহন থেকে নির্গত কালো ধোয়া বায়ুদূষণের আরেকটি বড় কারণ। পরিবহন সেক্টরে এসব অনিয়ম পর্যবেক্ষণ বা তদারকি এবং শাস্তির বিধান কার্যকর করার আইনি ব্যবস্থার কথা উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে তা মেনে চলা হচ্ছে না। ঢাকা শহর ৩৬০ বর্গ কিলোমিটার এতো অল্প পরিসর এলাকায় ধারণ ক্ষমতার দ্বিগুণের বেশি যানবাহন থাকার কারণে নগরীর দূষণ জ্যামেতিক হারে বাড়ছে। পাশাপাশি ঢাকার জনসংখ্যা কাম্য জনসংখ্যার দ্বিগুণের বেশি হওয়াতে যানজটও তীব্রতর হচ্ছে। অনিয়মের কারণে মহানগরী ঢাকা চার প্রকার দূষণ যেমন মাটিদূষণ, পানিদূষণ, বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ সবকিছুই আন্তর্জাতিক সহনীয় মাত্রাকে ছাড়িয়ে গেছে। ধুলোবালি এবং যত্রতত্র ময়লা, আবর্জনা অপরিকল্পিত নগরায়নের কারণে বাড়ছে।

আমরা অসচেতন বলেই নিজের শহরটাকে ভালো রাখতে পারছি না। যে বাসাবাড়িতে আমরা থাকি সেটাও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন নয় বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে তাদের জরিপে। প্রশ্ন হলো, এটা তো বাইরের লোক এসে পরিষ্কার করে দিয়ে যাবে না। আমি লন্ডন, কানাডা, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড সফর করতে গিয়ে দেখেছি, এসব দেশের মানুষ নিজেদের বাড়ি ঘর তারা নিজেরাই পরিষ্কার করছে। এটা তারা নিত্যকার কাজ হিসেবে গণ্য করে। আমাদের দেশে আর্থিকভাবে সচ্ছল মানুষরাও দূষণ ছড়ায়। তাদের আসপাশের এলাকাগুলোতে দৃষ্টি দিলে তার প্রমাণ মেলে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অঙ্গ। প্রথমে নিজের মনকে পরিষ্কার করতে হবে। কারণ, নিজের মন পরিষ্কার নাহলে দেশ পরিষ্কার হবে না। ঢাকা বিশ্বের সেরা নগরীগুলোর একটি হতে পারছে না বহুবিধ অনিয়মের কারণে। ঢাকায় একই রাস্তায় সবধরনের যানবাহন চলে যেমন, ইজিবাইক, সাইকেল, রিকশা, অটো রিকশা, ঠেলা, ভ্যান, ট্রাক, বাস, লরি, প্রাইভেট কার এবং অ্যাম্বুলেন্স। গন্তব্যস্থানে পৌঁছাতে সময় লাগে দ্বিগুণের চেয়েও বেশি। নগরীর দূষণ ছড়াতে বহুমাত্রিক বাহনগুলো বহুলাংশে দায়ী। বাহনগুলো থেকে নির্গত ধোঁয়া এবং হাইড্রলিক্স হর্ন যা হৃদরোগ ও শ্বাসকষ্ট এবং বধিরতা বাড়িয়ে দেয়। ঢাকার পায়ে চলা পথে পুরোটাই এবং মূল সড়কে দুই পাশে ৮ থেকে ১০ ফুট জায়গা দখল করে রাখে সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীরা। মানুষের জন্য ঢাকার রাস্তায় চলাফেরা অনেকটা অনিরাপদ এবং জীবনের জন্য হুমকিও বটে। এর পরে আছে এলোপাতাড়ি গাড়ি দীর্ঘ সময়ের জন্য মূল সড়কে পার্কিং করে রাখা হয়। রাস্তার মোড়ে মোড়ে ফেলে রাখা বা জমে থাকা ময়লার স্তূপ থেকে দুর্গন্ধ ছড়ায়। বায়ুদূষণে ঢাকায় বহুমুখী চর্মরোগ ব্যাপকতর রূপ ধারণ করেছে। এলাকাগুলো এখন আর আবাসিক এলাকা না বলে বাণিজ্যিক এলাকা হিসাবে বেশি পরিচিতি লাভ করেছে। পরিবেশ আইনে লেখা রয়েছে, আবাসিক এলাকায় কস্মিনকালেও ব্যবসা-বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারবে না। বিষয়টি আইনগতভাবে দ-নীয় অপরাধ বলে বিবেচিত থাকার পরেও সিস্টেমকে কেউ মানতে চাচ্ছে না। ঢাকার বায়ুদূষণে সহায়ক সকল ব্যবস্থাপনা সরিয়ে ফেলতে হবে এবং আইনি কাঠামোর মাধ্যমে নিষিদ্ধ করতে হবে। সড়ক দখল করে অবৈধ পার্কিং বন্ধসহ দখল হয়ে যাওয়া সড়ক উদ্ধার করতে হবে। বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক পথগুলো যানজটমুক্ত রাখতে হবে। নগরীকে একটি পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যবান্ধব শহর হিসেবে গড়ে তুলতে হলে উল্লেখিত নিয়মের বিকল্প নেই। এক জরিপে দেখা যায়, ঢাকার বায়ুদূষণে শ্বাসযন্ত্রের রোগ, হৃদরোগ, স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গুরুতর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, যা শিশুদের ফুসফুসের বৃদ্ধি ব্যাহত করে এবং প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণœতা বাড়ায়। এছাড়া পরিবেশ ও বন্যপ্রাণীরও ক্ষতি করে। বায়ুদূষণে পরিবেশগত প্রভাব পড়ে অ্যাসিড বৃষ্টি এটি ফসল, বন এবং জলজ বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি করে। ধোঁয়াশার দৃশ্যমানতা কমিয়ে দেয় এবং পরিবেশকে বিষাক্ত করে তোলে। জলবায়ু পরিবর্তন ওজোন স্তরের ক্ষতি করে, যা বৈশ্বিক পরিবর্তনের কারণ হয়। বায়ুদূষণ প্রাণীদের মধ্যে জন্মগত ত্রুটি, প্রজনন সমস্যা এবং নানা ব্যাধি সৃষ্টি করে বিশেষ করে জলজ বাস্তুতন্ত্রে বিষাক্ত পদার্থ জমা হওয়ার কারণে। সংক্ষেপে বায়ুদূষণ মানবস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য একটি মারাত্মক হুমকি, যা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে,ু বায়ুদূষণে অর্থনৈতিক ক্ষতি প্রতিদিন প্রায় বিশ হাজার কোটি টাকা। শুধু রাজধানীর অপরিকল্পিত সড়ক ব্যবস্থাপনা ও যানজটে দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ জ্বালানির অপচয় হয়, যার মূল্য কয়েক শত কোটি টাকা। যানজটে মোট জিডিপির প্রায় ৬ শতাংশ ক্ষতি হয়। নগর এলাকায় ক্রমান্বয়ে বাসযোগ্যতা কমছে। রাষ্ট্রযন্ত্র বহুবছর ধরে ঢাকাসহ বিভিন্ন বিভাগীয় শহর, জেলা, উপজেলা ও পৌর এলাকার নগর উন্নয়ন, ব্যবস্থাপনা, পরিকল্পনা ও পরিবেশের ব্যাপারে কার্যকর উদ্যোগ নিতে ব্যর্থ হয়েছে।

ঢাকার যানজট-জলজট-শব্দদূষণ দূর করতে সময়োপযোগী পদক্ষেপ নিতে পারেনি রাষ্ট্র। শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে অকারণে হর্ন বাজানো বন্ধ করতে হবে। এতে শ্রবণ প্রতিবন্ধীর সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। শব্দদূষণে হৃদ রোগে বহুলোক মারা যাচ্ছে। ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন মোট ১২৯টি ওয়ার্ড রয়েছে। এলাকার পাড়া মহল্লায় এর সমস্যা সমাধানে মানুষ এবং কমিউনিটিকে সম্পৃক্ত করতে পারেনি। বিশেষত নগরে নি¤œআয়ের ও প্রান্তিক এলাকায় বসবাসরত মানুষের দুঃখ-দুর্দশা আরও বেড়েছে। ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকার জাতীয় নগর নীতি এবং স্থানীয় পরিকল্পনা অধ্যাদেশ অনুমোদন দিয়েছে, যা আগামী দিনগুলোতে নগর এলাকার ইতিবাচক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পারে। আগামী নির্বাচিত সরকারকে বড় প্রকল্পে মনোযোগ না দিয়ে নগর এলাকার সমস্যা সমাধানে কার্যকর পরিকল্পনা, সমন্বিত উদ্যোগ, উন্নয়ন ব্যবস্থাপনা ও জনঅংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং এন্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি) কর্তৃক অনলাইনে আয়োজিত পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিশ্লেষণী অনুষ্ঠানে বক্তারা উপরোক্ত মতামত ব্যক্ত করেন। অপ্রিয় সত্য, সারাদেশে একটিও বায়ুদূষণমুক্ত পরিকল্পিত শহর নেই। আমাদের নগর বিষয়ক সমস্যাগুলো ভুল নীতিকৌশলের কারণে বায়ুদূষণের কোনো সুরাহা হচ্ছে না। ব্যক্তি সচেতনতা না থাকার কারণে ঢাকায় বসবাসরত প্রায় তিন কোটি মানুষের আবাসিক এলাকাগুলো বায়ুদূষণে চরম হুমকি হয়ে দেখা দিচ্ছে। সড়কের মোড়ে মোড়ে ছোট খাটো টিলার মতো বর্জ্য-আবর্জনা জমে থাকতে দেখা যায়। ঢাকার নদীর পানি এতোটাই দূষণযুক্ত যে এখানে গোসল করলে দুরারোগ্য চর্মরোগে আক্রান্ত হওয়া অবধারিত। এক কথায় ঢাকার বাতাস, মাটি এবং খাদ্য সবকিছুই দূষণে আক্রান্ত, যা শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। তাই বায়ুদূষণ রোধে অনতিবিলম্বে সরকারকে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। একটি স্মার্ট, দূষণ ও যানজট মুক্ত ঢাকা গড়ে তোলা সময়ের ন্যায়সঙ্গত দাবি।

 


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ