• ঢাকা, বাংলাদেশ রবিবার, ২৪ মে ২০২৬, ০২:০৪ পূর্বাহ্ন
  • [কনভাটার]
নোটিশ
সারাদেশের জেলা ও উপজেলায় সংবাদকর্মী আবশ্যক। নিজেকে যোগ্য মনে করলে এখনই যোগাযোগ করুন Mob: 01778840333, Email: m.r.01778840333@gmail.com

ঢাকার রাস্তায় এআই জাদু, বসবে সব সিগন্যালে

sagar crime reporter / ৩৪ জন দেখেছে
আপডেট : শনিবার, ২৩ মে, ২০২৬

ঢাকার রাস্তায় এআই জাদু, বসবে সব সিগন্যালে

 

রাত ৯টা, গত বুধবার। রাজধানীর কারওয়ান বাজার মোড়। এখানে এসে মিলেছে চারটি সড়ক। তিনটি সড়কের মুখে থেমে আছে গাড়ি। শুধু বাংলামোটর থেকে ফার্মগেটমুখী সড়কে যানবাহন চলছে।

দুই মিনিট এভাবে চলার পর বিপরীত পাশের রাস্তায় থাকা ট্রাফিকের লালবাতি জ্বলে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেল যানবাহন। শুধু থামেইনি, যানবাহনগুলো ‘স্টপ লাইনের’ (সাদা রঙের দাগ, যা আগে গাড়ি থামাতে হয়) ভেতরেই ছিল।

কদিন আগেও এ সিগন্যালে গাড়ি থামাতে ট্রাফিক পুলিশের সদস্যদের রীতিমতো ছোটাছুটি করতে হতো। এখন সেটা লাগছে না। ট্রাফিক আইন মানাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ক্যামেরা বসানোর পর থেকেই এ পরিবর্তন।

রাজধানীর ৩০টি মোড় বা ক্রসিংয়ে এই ক্যামেরা বসানো হয়েছে। এর মাধ্যমে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনকারী যানবাহনকে জরিমানা করা হচ্ছে। ভয়ে চালকেরা আইন মানছেন।

কারওয়ান বাজার মোড়ে গত বুধবার রাতে দায়িত্ব পালনকারী ট্রাফিক পুলিশ সদস্য ছোটন বড়ুয়া প্রথম আলোকে বলেন, ‘আগে গাড়ি থামাতে যুদ্ধ করতে হতো। এখন লাল বাতি জ্বলে উঠলেই থেমে যাচ্ছে। শান্তিতে দায়িত্ব পালন করতে পারছি। তবে ব্যাটারিচালিত রিকশাগুলো সমস্যা সৃষ্টি করছে।’

সফটওয়্যারের দেওয়া নির্দেশনা অনুযায়ী, আইন লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটলে সেই গাড়ি শনাক্ত করছে ক্যামেরা। সে অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট গাড়ির মালিকের নামে ডিজিটালি মামলা দেওয়া হচ্ছে।

৭ মে শুরু

ঢাকার বিভিন্ন মোড়ে ৭ মে থেকে পরীক্ষামূলকভাবে এআই প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু করে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ। এআইভিত্তিক ক্যামেরায় সড়ক পরিবহন আইন লঙ্ঘন শনাক্ত করার সফটওয়্যার সংযোজন করা হয়েছে। সফটওয়্যারের দেওয়া নির্দেশনা অনুযায়ী, আইন লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটলে সেই গাড়ি শনাক্ত করছে ক্যামেরা। সে অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট গাড়ির মালিকের নামে ডিজিটালি মামলা দেওয়া হচ্ছে।

ডিএমপি সদর দপ্তরে গত ২৯ এপ্রিল পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির এ সফটওয়্যার উদ্বোধন করেন। এরপর ৩ মে গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে চালক ও গাড়ির মালিকদের ‘ভিডিও ফুটেজের মাধ্যমে ট্রাফিক মামলার’ বিষয়ে সতর্ক করা হয়। ৭ মে থেকে নির্ধারিত মোড়ে স্বয়ংক্রিয় মামলা কার্যক্রম শুরু করে পুলিশ।

ট্রাফিক পুলিশের এ উদ্যোগকে স্বাগত জানাচ্ছেন চালকদের অনেকেই। গত বুধবার দুপুরে রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের সামনে সবুজবাতি জ্বলার অপেক্ষায় ছিলেন মাইক্রোবাসচালক মো. মহিউদ্দিন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘নিঃসন্দেহে ভালো উদ্যোগ। তবে লালবাতি জ্বলা অবস্থায় মাঝেমধ্যে ট্রাফিক সদস্যরা যানবাহন ছেড়ে দিচ্ছেন। তখন চলতে গেলে মামলা হবে কি না, তা বুঝতে পারছি না।’

আগে গাড়ি থামাতে যুদ্ধ করতে হতো। এখন লাল বাতি জ্বলে উঠলেই থেমে যাচ্ছে। শান্তিতে দায়িত্ব পালন করতে পারছি। তবে ব্যাটারিচালিত রিকশাগুলো সমস্যা সৃষ্টি করছে।

ট্রাফিক পুলিশ সদস্য ছোটন বড়ুয়া

‘পিটিজেড’ ক্যামেরায় নিয়ন্ত্রণ

ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন করা গাড়ির নম্বর শনাক্ত করতে এআইভিত্তিক ‘পিটিজেড ক্যামেরা’ ব্যবহার করছে পুলিশ। এটি ‘প্যান-টিল্ট-জুম’ প্রযুক্তির উন্নত নিরাপত্তা ক্যামেরা। জনসমাগমে পর্যবেক্ষণের জন্য এ ক্যামেরা ব্যবহার করা হয়। এটি ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরে ঘুরে ভিডিও ও ছবি ধারণ করতে পারে। চলন্ত বস্তু বা ব্যক্তিকে অনুসরণ করতে পারে।

এ ক্যামেরা সহজেই কম্পিউটার বা মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। ‘অপটিক্যাল জুমের’ মাধ্যমে অনেক দূর থেকে স্পষ্ট ছবি বা গাড়ির নম্বর প্লেট শনাক্ত করতে পারে। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, একেকটি ক্যামেরার দাম ৬০ হাজার টাকার বেশি।

ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রাথমিকভাবে সফটওয়্যারে ছয় ধরনের আইন অমান্যের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নির্দেশনা অনুযায়ী, এসব আইন অমান্য করা যানবাহন শনাক্ত করে নম্বরপ্লেটসহ ছবি তুলে রাখছে এ ক্যামেরা। সেসব ছবি-ভিডিও ডিএমপি সদর দপ্তরের ট্রাফিক টেকনিক্যাল ইউনিটের (টিটিইউ) সার্ভারে জমা হচ্ছে।

সফটওয়্যারের সঙ্গে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) সার্ভার যুক্ত করা হয়েছে। ফলে সহজেই আইন লঙ্ঘনকারী যানবাহনের নম্বর দিয়েই মালিকের বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। সার্ভারে জমা হওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে মালিকের নামে মামলা দেওয়া হচ্ছে।

ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন করা গাড়ির নম্বর শনাক্ত করতে এআইভিত্তিক ‘পিটিজেড ক্যামেরা’ ব্যবহার করছে পুলিশ। এটি ‘প্যান-টিল্ট-জুম’ প্রযুক্তির উন্নত নিরাপত্তা ক্যামেরা। জনসমাগমে পর্যবেক্ষণের জন্য এ ক্যামেরা ব্যবহার করা হয়। এটি ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরে ঘুরে ভিডিও ও ছবি ধারণ করতে পারে। চলন্ত বস্তু বা ব্যক্তিকে অনুসরণ করতে পারে।

ট্রাফিক বিভাগ জানিয়েছে, পর্যায়ক্রমে রাজধানীর সব সিগন্যাল বাতির খুঁটিতে এ ধরনের ক্যামেরা বসানো হবে। সংখ্যা দাঁড়াবে ৫০০টিতে। এখন মহাখালী বাস টার্মিনালসংলগ্ন এলাকায় নতুন ক্যামেরা বসানোর কাজ চলছে।

৫০০ ক্যামেরা বসানোর পরিকল্পনা

ট্রাফিক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, পুলিশ শুরুতে ঢাকার ৩০টি মোড়ে এআই ক্যামেরা স্থাপন করেছে। আগে থেকেই ৮০টি ক্যামেরা ছিল, যেগুলো এআই প্রযুক্তিতে নিয়ে আসা হয়েছে। সব মিলিয়ে মোট ১১০টি ক্যামেরা থেকে ভিডিও চিত্র সংগ্রহ করে এআই দিয়ে বিশ্লেষণ করা হয়।

ট্রাফিক বিভাগ জানিয়েছে, পর্যায়ক্রমে রাজধানীর সব সিগন্যাল বাতির খুঁটিতে এ ধরনের ক্যামেরা বসানো হবে। সংখ্যা দাঁড়াবে ৫০০টিতে। এখন মহাখালী বাস টার্মিনালসংলগ্ন এলাকায় নতুন ক্যামেরা বসানোর কাজ চলছে।

ট্রাফিক আইনে থাকা নিয়মের ব্যতয় হলেই মামলা দেওয়া হচ্ছে। উল্টো পথে গাড়ি চালানো, সিগন্যাল অমান্য করা, জেব্রাক্রসিংয়ে গাড়ি উঠিয়ে দেওয়া, স্টপ লাইন না মানা, বাঁ লেন বন্ধ করে রাখা, হুটহাট লেন পরিবর্তন করা, রাস্তা আটকে যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা করানো এবং অবৈধ পার্কিংকে গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

৫৪৮ জনের নামে মামলা

ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, এআই ক্যামেরা ব্যবহার শুরুর পর ১৩ দিনে ডিএমপির সার্ভারে প্রায় ১২ হাজার ভিডিও জমা পড়ে। পুলিশ সদস্যরা সেগুলো যাচাই–বাছাই করে আইন ভঙ্গের মাত্রা অনুযায়ী মামলা দিচ্ছেন। এখন পর্যন্ত ৫৪৮ জনের নামে মামলা দেওয়া হয়েছে।

ট্রাফিক আইনে থাকা নিয়মের ব্যতয় হলেই মামলা দেওয়া হচ্ছে। উল্টো পথে গাড়ি চালানো, সিগন্যাল অমান্য করা, জেব্রাক্রসিংয়ে গাড়ি উঠিয়ে দেওয়া, স্টপ লাইন না মানা, বাঁ লেন বন্ধ করে রাখা, হুটহাট লেন পরিবর্তন করা, রাস্তা আটকে যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা করানো এবং অবৈধ পার্কিংকে গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

ডিএমপি ট্রাফিকের এআই প্রযুক্তির বিষয়টি দেখভাল করছেন জ্যেষ্ঠ সিস্টেম অ্যানালিস্ট শারমিন আফরোজ। গত বুধবার দুপুরে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আগামী সপ্তাহ থেকে গণপরিবহনে যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা, প্রাইভেট কারে সিট বেল্ট না বাঁধা, মোটরসাইকেলচালক ও আরোহীদের হেলমেট না থাকার মতো অপরাধকেও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে।’

মুঠোফোনে যাবে মামলার তথ্য

ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন করার ঘটনায় জরিমানা বা মামলার তথ্য এখন ডাকযোগে মালিকের কাছে পাঠানো হচ্ছে। পুলিশ বলছে, শিগগিরই মুঠোফোনে এই পাঠানো শুরু হবে।

ডিএমপির জ্যেষ্ঠ সিস্টেম অ্যানালিস্ট শারমিন আফরোজ বলেন, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে চালকের আইন ভঙ্গের কয়েক সেকেন্ডের ভিডিও লিংকও পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে তাঁদের।

ট্রাফিক বিভাগ বলছে, আইন ভাঙলেই চালকের লাইসেন্সে ‘ডিমেরিট পয়েন্ট’ যুক্ত হবে। ড্রাইভিং লাইসেন্সে ১২টি পয়েন্ট থাকে। পয়েন্ট কাটতে কাটতে এক পর্যায়ে চালকের লাইসেন্সও বাতিল হতে পারে।

নিয়ন্ত্রণহীন ব্যাটারিচালিত রিকশা

ট্রাফিক পুলিশের কর্মকর্তারা বলছেন, ক্যামেরা বসানোর পরও ঢাকার সড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না। নিবন্ধন না থাকায় ক্যামেরায় আইন লঙ্ঘনের বিষয়টি ধরা পড়লেও মামলা দেওয়া যাচ্ছে না।

এ ছাড়া অনেক যানবাহনের নম্বরপ্লেট অস্পষ্ট। আবার কিছু যানবাহনে নম্বরপ্লেট নেই। ফলে ক্যামেরা সেসব যানবাহন শনাক্ত করতে পারছে না।

বিআরটিএ নির্ধারিত নম্বরপ্লেট ব্যবহার করতে ১১ মে গণবিজ্ঞপ্তি জারি করে ডিএমপি। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সড়কে চলাচলকারী নিবন্ধিত যানবাহনে সরকার কর্তৃক নির্ধারিত রং, নকশা ও আকারের নম্বরপ্লেট যথাযথ স্থানে লাগানোর আইনগত বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

এ বিষয়ে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) আনিসুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, নিবন্ধন নেই কিংবা অস্পষ্ট নম্বরপ্লেটযুক্ত যানবাহনের বিরুদ্ধে পবিত্র ঈদুল আজহার পর বড় অভিযান শুরু হবে।

ঢাকায় পুরোনো লক্কড়ঝক্কড় বাস চলে। এসব বাস অনেক সময় সিগন্যাল মানে না। মাসোহারা দিয়ে এসব বাস চলতে পারে বলে অভিযোগ রয়েছে। আশা করা হচ্ছে, এআই ক্যামেরার হাত থেকে বাসমালিকেরা রক্ষা পাবেন না।

এআই হলো ট্রাফিক ব৵বস্থাপনা নিয়ন্ত্রণে আনার শেষ ওষুধ (দাওয়া)। এই উদ্যোগ হোঁচট খেলে কিন্তু আর কিছু করার থাকবে না। তাই শতভাগ সুফল পেতে হলে নীতিগত কিছু পরিবর্তন আনতেই হবে।

বিশ্বের অনেক দেশেই ট্রাফিক ব্যবস্থায় এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে সুফল পাওয়া যাচ্ছে। গালফ নিউজের গত ১৭ মার্চের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকার দেশটির বিভিন্ন শহরে ৫০টি এআইভিত্তিক ট্রাফিক পর্যবেক্ষণব্যবস্থা স্থাপন করার অনুমোদন দিয়েছে। এই কেন্দ্রগুলো শুধু ট্রাফিক আইন ভাঙার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে তা নয়, বরং ট্রাফিক ব্যবস্থার বিভিন্ন ধরনের তথ্য সরবরাহ করবে। এসব তথ্য সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করবে।

পরিবহনবিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, এআই হলো ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণে আনার শেষ ওষুধ (দাওয়া)। এই উদ্যোগ হোঁচট খেলে কিন্তু আর কিছু করার থাকবে না। তাই শতভাগ সুফল পেতে হলে নীতিগত কিছু পরিবর্তন আনতেই হবে।

অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান বলেন, যেসব সড়কে ডিজিটাল ট্রাফিক লাইট ও এআই ক্যামেরা বসেছে, সেসব সড়কে অনুমোদনহীন যানবাহনকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ