রাজধানীর পল্লবীতে শিশুকে ধর্ষণ ও নৃশংস হত্যার বিচার দাবিতে গতকাল শুক্রবার গুলশান-২ নম্বর গোলচত্বরে গুলশান সোসাইটির ব্যানারে মানববন্ধন ও সমাবেশ করেন স্থানীয় বাসিন্দারা- শাপলানিউজ.কম
আপডেট: ২৩ মে ২০২৬
রাজধানীর পল্লবীতে ধর্ষণের পর শিশুকে হত্যার ঘটনায় দেশে বিক্ষোভ হচ্ছে। অপরাধীদের দ্রুত বিচারের দাবিতে গতকাল শুক্রবার রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধসহ নানা কর্মসূচি পালন করেছেন সাধারণ মানুষ। তাদের দাবি, জড়িত ব্যক্তিদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে হবে।
শুক্রবার সন্ধ্যায় মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরে সড়ক অবরোধকারীদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এক পর্যায়ে টিয়ার গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয় পুলিশ। এর আগে দুপুর ২টার পর থেকে সেখানে বিক্ষোভ শুরু করেন তারা। সন্ধ্যার পর কালশী রোডের ফুলকলি ও আধুনিক মোড় এলাকায় সড়ক অবরোধ করেন স্থানীয় লোকজন। বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে পল্লবী থানার সামনে পাঁচ শতাধিক নারী-পুরুষ অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন। শিশুহত্যার বিচার দাবিসহ পুলিশের বিরুদ্ধে নানা স্লোগান দেন তারা।
মামলার তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগামীকাল রোববার সকালে ময়নাতদন্ত এবং ডিএনএ রিপোর্ট হাতে পাওয়ার কথা। ইতোমধ্যে মামলার তদন্ত কার্যক্রম প্রায় সম্পন্ন হয়েছে। রিপোর্টগুলো হাতে পাওয়ার পর ওই দিন বিকেলেই আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করার সম্ভাবনা রয়েছে। এদিকে অভিযুক্ত সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের পক্ষে কোনো আইনজীবী আইনি লড়াইয়ে অংশ নেবেন না বলে ঘোষণা দিয়েছে ঢাকা আইনজীবী সমিতি। শিশুটির প্রতি মানবিক দায়বদ্ধতা ও অপরাধের ভয়াবহতা বিবেচনা করে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
গত মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে পল্লবীর একটি বাড়ির তিনতলার ফ্ল্যাট থেকে শিশুটির খণ্ডিত লাশ উদ্ধার হয়। ঘটনার পর জানালার গ্রিল ভেঙে মূল অভিযুক্ত সোহেল রানা পালিয়ে যান। ঘটনাস্থল থেকে তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে গ্রেপ্তার করা হয়। ওই দিন সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় সোহেল রানাকে। গত বুধবার সোহেল আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। সোহেল ও স্বপ্না বর্তমানে কারাগারে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গতকাল দুপুরের পর জামায়াত-শিবিরের ব্যানারে দলটির নেতাকর্মীরা মিরপুর-১০ গোলচত্বরে জড়ো হতে থাকেন। তারা শিশুহত্যার বিচার দাবি করে সড়কে অবস্থান নেন। ৩টার পর থেকে ছাত্র-জনতা জড়ো হতে থাকে সেখানে। এতে অংশ নেওয়া নারী-পুরুষের অনেকের প্রশ্ন, আজ পল্লবীতে শিশু হত্যার শিকার, কাল যে কারও সন্তান এই নৃশংসতার শিকার হবে না, সেই নিশ্চয়তা কোথায়। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, একের পর এক শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা ঘটলেও অপরাধীরা দ্রুত শাস্তি না পাওয়ায় এমন নৃশংসতা থামছে না; বরং বাড়ছে।
৩টার দিকে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা চলে গেলেও সাধারণ ছাত্র-জনতা অবস্থান নিয়ে শিশু হত্যার বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ করতে থাকে। অবরোধের কারণে মিরপুর-১০, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, পল্লবীসহ আশপাশের সড়কে যান চলাচল ধীর হয়ে যায়। ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রীরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
সরেজমিন দেখা যায়, বিক্ষোভকারীদের অনেকের হাতে ছিল বিভিন্ন প্রতিবাদী প্ল্যাকার্ড। এ সময় অনেকে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের পদক্ষেপ চান।
সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে অবরোধকারীদের সড়ক থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ বাধে। ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। একপর্যায়ে টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে পুলিশ। এ সময় কয়েকজন বিক্ষোভকারীকে লাঠিপেটা করতেও দেখা যায়।
মিরপুর থানার ওসি হাফিজুর রহমান বলেন, দুপুরের পর মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরে বিক্ষোভকারীরা অবস্থান নিলেও তাদের কোনো ধরনের বাধা দেওয়া হয়নি। তবে সন্ধ্যায় বিক্ষোভকারীদের সরে যেতে অনুরোধ করা হলে তারা রাজি হননি। একপর্যায়ে ছত্রভঙ্গ করে সড়ক থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এরপর সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
এদিকে বিকেল সোয়া ৫টার দিকে পাঁচ শতাধিক মানুষ পল্লবী থানার থানার সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করে। কিছুক্ষণ পর তারা চলে যান।
প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাসে আশাবাদী শিশুটির বাবা
সিরাজদীখান (মুন্সীগঞ্জ) প্রতিনিধি জানিয়েছেন, গতকাল মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখানে শিশুটির কুলখানি হয়। এতে অংশ নিতে গতকাল শিশুটির বাবা-মা গ্রামের বাড়ি যান। জুমার নামাজ শেষে কবর জিয়ারত করেন শিশুটির বাবা ও মুন্সীগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য শেখ মো. আব্দুল্লাহসহ স্থানীয়রা। সেখানে আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
নিহতের বাবা বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী আমাকে বলেছেন, একজন মেয়ের বাবা হিসেবে এবং একজন বড় ভাই হিসেবে আমি এখানে (তাঁর বাসায়) এসেছি। তাঁর ভালোবাসা এবং আশ্বাসে আমি শতভাগ বিশ্বাসী যে, আমার মেয়ে হত্যার বিচার পাব। সুষ্ঠু এবং দ্রুত বিচার পাব।’
তদন্ত কার্যক্রম প্রায় শেষ
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার এসআই অহিদুজ্জামান ভুঁইয়া নিপুণ সমকালকে বলেন, ‘তদন্ত কার্যক্রম প্রায় সম্পন্ন। বর্তমানে প্রয়োজনীয় নথিপত্র ও ডকুমেন্ট প্রস্তুতের কাজ চলছে। ইতোমধ্যে দুই আসামির স্থায়ী ঠিকানা যাচাই-বাছাই করা হয়েছে। আগামীকাল রোববার সকালে ময়নাতদন্ত এবং ডিএনএ রিপোর্ট হাতে পেতে পারি। সেটি হাতে পেলে ওইদিন বিকালেই আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করার সম্ভাবনা রয়েছে।’
তিনি বলেন, অজ্ঞাতনামা আরেকজন জড়িত থাকার যে তথ্য ছড়ানো হচ্ছে, তা সঠিক নয়। বিষয়টি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তদন্তকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা। ঘটনাস্থলের এক প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছেন, একজন ব্যক্তি দ্রুত সেখান থেকে পালিয়ে গেলে তিনি ‘চোর চোর’ বলে চিৎকার করেন। সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।
সোহেলের অতীত কর্মকাণ্ড ভালো ছিল না
অভিযুক্ত সোহেল রানা আগেও বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল বলে জানিয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। গতকাল ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম এ তথ্য জানান।
তিনি বলেন, হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দ্রুত আদালতে জমা দেওয়া হবে। প্রধান অভিযুক্ত সোহেল রানা আগেও নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত ছিল। তার অতীত কর্মকাণ্ড ভালো ছিল না। তার বিরুদ্ধে এর আগে পাবনার চাটমোহর থানায় একটি সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলা ছিল।
মাদক ব্যবসায়ী ও চোর হিসেবে পরিচিত
সোহেল রানার বাড়ি নাটোরের সিংড়া উপজেলার ৪ নম্বর কলম ইউনিয়নের মহেষ চন্দ্রপুর গ্রামে। সোহেল এলাকায় মাদক মাদক ব্যবসায়ী ও চোর হিসেবে পরিচিত। তার বিরুদ্ধে সরকারি ব্রিজের রড চুরির ঘটনায় সিংড়া থানায় মামলা রয়েছে। প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে অনেক আগে তার বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে। চার বছর আগে সে এলাকা থেকে চলে যায়। এরপর আর কখনও এলাকায় যায়নি। বছর দুয়েক আগে সে স্বপ্না আক্তারকে বিয়ে করে।
হত্যার দ্রুত বিচার দাবিতে মানববন্ধন
হত্যার ঘটনায় দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে পৃথক মানববন্ধন করেছে সামাজিক ও শিশু অধিকারভিত্তিক সংগঠনগুলো। গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে শিশু-কিশোর সংগঠন কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসর এবং গুলশান-২ গোলচত্বরে গুলশান সোসাইটি এসব কর্মসূচির আয়োজন করে। এ ছাড়া দুপুরে পল্লবী বি-ব্লকে এলাকাবাসী মানববন্ধন করেন।
কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসর আয়োজিত মানববন্ধনে সংগঠনটির নেতারা শিশু নির্যাতনসহ সব ধরনের অপরাধ দমনে বিচার বিভাগকে আরও সক্রিয় করার দাবি জানান।
খেলাঘরের সভাপতিমণ্ডলীর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ডা. মাখদুমা নার্গিস রত্না বলেন, দেশে বিজ্ঞানভিত্তিক ও আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। কন্যাশিশুরা যেমন পাশবিকতার শিকার হচ্ছে, তেমনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ছেলে শিশুরাও নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। এ ধরনের ঘটনা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
এদিকে গুলশান সোসাইটি আয়োজিত মানববন্ধনে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেয়। সংগঠনটির মহাসচিব মজিবুর রহমান মৃধার নেতৃত্বে আয়োজিত কর্মসূচিতে বক্তারা বলেন, শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
বাসা থেকে বের হলে ভয় লাগে
গতকাল বেলা ১১টায় খিলগাঁওয়ের সি-ব্লকে এই মানববন্ধনের আয়োজন করে পল্লীমা সংসদ। এতে অংশ নিয়ে সাউথ পয়েন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী নুজহাত বলে, ‘বাসা থেকে যখন বের হই, স্কুলে যাই, বাসায় ফিরি– ভয় লাগে। আমরা সব মেয়েরা মুক্তভাবে নিরাপদে সব জায়গায় ঘুরে বেড়াতে চাই।
বিভিন্ন জেলায় বিক্ষোভ
রাজশাহী নগরীর সাহেব বাজার জিরোপয়েন্টে জামায়াতে ইসলামী মানববন্ধন ও মিছিল করে। চট্টগ্রামে বিক্ষোভ করে এনসিপি নেতাকর্মী ও স্থানীয় লোকজন। ঢাকার সাভারের আশুলিয়ায় বিক্ষোভ করেছে শিশু ও শ্রমজীবীরা। পাবনার ঈশ্বরদীতে আলোর পথযাত্রী নামে একটি সামাজিক সংগঠনের ব্যানারে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করা হয়। কুড়িগ্রামের বাজারহাটে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেন স্থানীয় এনসিপির নেতাকর্মীরা। দিনাজপুরে এক অনুষ্ঠানে সমাজকল্যাণ মন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেন, যারা শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও খুন করে তাদের কোনো ছাড় নেই।