• ঢাকা, বাংলাদেশ সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬, ০৭:২১ অপরাহ্ন
  • [কনভাটার]
নোটিশ
সারাদেশের জেলা ও উপজেলায় সংবাদকর্মী আবশ্যক। নিজেকে যোগ্য মনে করলে এখনই যোগাযোগ করুন Mob: 01778840333, Email: m.r.01778840333@gmail.com

লঞ্চে উঠতেই লড়াই

sagar crime reporter / ৬১ জন দেখেছে
আপডেট : বৃহস্পতিবার, ১৯ মার্চ, ২০২৬

সরেজমিন সদরঘাট

লঞ্চে উঠতেই লড়াই

 

‘এ দেউলা, দেবীরচর, লালমোহন। ফার্স্ট টিপ, ফার্স্ট টিপ’, ‘বগা, পটুয়াখালী, কালাইয়া’—গতকাল বুধবার দুপুরে এমনই হাঁকডাক একটানা ভেসে আসছিল রাজধানীর সদরঘাটের পন্টুন থেকে। সামনেই সারি সারি দাঁড়িয়ে দোতলা-তিনতলা লঞ্চ। এদের কোনোটি দুপুরে, কোনোটি সন্ধ্যায়, আবার কোনোটির রাতে ছেড়ে যাওয়ার কথা। তবে দুপুর গড়াতেই অধিকাংশ লঞ্চ প্রায় যাত্রীতে ঠাসা।

সেখানেই কিছু দূরে দাঁড়িয়ে সুন্দরবন-১৪ লঞ্চ। ঢাকা থেকে পটুয়াখালীর উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়ার কথা বেলা দুইটায়। তবে তিনটার সময়ও লঞ্চের বাইরে হাঁকডাক চলছে। হাতে, কাঁধে, মাথায় ব্যাগ, বস্তায় মালামাল নিয়ে অনেকেই লঞ্চে উঠছেন, জায়গা না পেয়ে আবার নেমেও আসছেন।

লঞ্চের বাইরে পন্টুনের এক কোনায় বেশ কয়েকটি ব্যাগ রেখে সেটির ওপর বসে আছেন শরিফুল আলম। সঙ্গে পরিবারের তিন নারী সদস্য। বললেন, ‘পটুয়াখালী যাব। একটু স্বস্তিতে যাওয়ার জন্য এখানে আসছি। তবে লঞ্চে সিট মেলেনি। ওরা (লঞ্চের কর্মীরা) বলল, আরেকটা লঞ্চ নাকি আসবে। তাই পন্টুনে বসে আছি।’

একই লঞ্চের ছাদে জায়গা পেয়েছেন মিলন নামের একজন যাত্রী। তিনি বলেন, ‘জায়গা পেতে সকাল ছয়টার সময় আসতে হয়েছে। অনেকে আগের দিন রাতেও এসেছেন। আগে থেকে যারা জায়গা করে নিয়ে বসেছিল, তাদেরও সরিয়ে সরিয়ে অতিরিক্ত যাত্রীদের জন্য জায়গা করা হচ্ছে।’

শরিফুল ও মিলনের মতোই ঈদে বাড়ি ফিরতে গতকাল সকাল থেকেই সদরঘাটে ভিড় করেন হাজার হাজার মানুষ। তাঁদের বেশির ভাগই ডেক এবং সোফার যাত্রী। কেউ আগেভাগে এসে সিট নিশ্চিত করতে পেরেছেন। আর কেউ কিছুটা দেরি করে আসায় যাত্রা নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। সব মিলিয়ে স্বস্তির লঞ্চযাত্রা পদে পদে হয়ে উঠেছে ভোগান্তির।

লঞ্চে ঈদযাত্রায় ভোগান্তির শুরু হয়েছে রাজধানীর পুরান ঢাকার বাংলাবাজার মোড় থেকে। বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা যাত্রী এবং যানবাহনের কারণে এই মোড় থেকেই তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। ফলে অনেক যাত্রীকেই ভারী মালামাল নিয়ে নেমে হেঁটে হেঁটে সদরঘাটের দিকে যেতে দেখা যায়। এ সময় মাথায় এবং হাতে মালামাল বহনকারী এক যাত্রী বলেন, ‘কতক্ষণ ভিড়ে বসে থাকব। দেরি করলে আবার ওদিকে লঞ্চে জায়গা পাব না। তাই বাধ্য হয়ে নেমে হাঁটছি।’

বাংলাবাজার মোড় পেরিয়ে সদরঘাটের মূল ফটকের সামনেও মানুষের ভিড়। সবাই ছুটছেন পন্টুনে থাকা লঞ্চগুলোর দিকে। সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা প্রতিটি লঞ্চের সামনেই যাত্রীদের চাপ। কেউ একা, কেউ পরিবারসহ। প্রায় সবার হাতেই মালামাল। বেশ কয়েকজন যাত্রীকে মোটরবাইক নিয়েও লঞ্চে উঠতে দেখা গেল।

১০ নম্বর পন্টুনে দাঁড়িয়ে থাকা এম ভি ইয়াদ-৩ লঞ্চের সামনে দাঁড়িয়ে লঞ্চটির কর্মী যাত্রীদের ডাকছেন। কখন ছাড়বে জিজ্ঞাসা করলে বললেন, ‘ভরলেই ছাড়ব’। তবে লঞ্চের ভেতরে উঁকি দিয়ে দেখা গেল, ডেকে প্রায় জায়গা নেই বললেই চলে। সামনের অংশেও মালামালসহ শুয়ে-বসে আছে মানুষ। ভরতে আর কতজন লাগবে জানতে চাইলে বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘কাজের সময় বিরক্ত কইরেন না।’

সবচেয়ে বেশি ভিড় দেখা গেল বরগুনা, ভোলা ও পটুয়াখালী রুটের লঞ্চগুলোর সামনে। এসব রুটে চলাচলকারী লঞ্চগুলো থেকে মালামাল নিয়ে অনেক যাত্রীকেই নেমে আসতে দেখা যায়। তাঁরা জানান, লঞ্চে জায়গা পাননি। কেউ বললেন, পরবর্তী লঞ্চের জন্য অপেক্ষা করবেন। আবার কেউ কাছাকাছি গন্তব্যের লঞ্চের খোঁজে চলে গেলেন।

সদরঘাট থেকে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ২০টির বেশি জেলার লঞ্চ ছেড়ে যায়। তবে ঢাকা থেকে বরিশাল রুটে চলাচলকারী লঞ্চগুলো আকারে বেশ বড় এবং জাঁকজমকপূর্ণ। এসব লঞ্চের কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, বেশির ভাগই ছাড়বে রাতে। কেবিনগুলো আগে থেকেই বুক হয়ে আছে। অন্য সিটগুলোর জন্য যাত্রীরা ভিড় করছেন। ঢাকা থেকে বরিশাল ডেকের ভাড়া ৩৫০ টাকা রাখা হচ্ছে। আর যে লঞ্চগুলোতে সোফা রয়েছে, সেগুলোতে ভাড়া রাখা হচ্ছে ৫০০ টাকা।

সেখানে ভিড় কিছুটা কম থাকলেও যাত্রীর চাপ রয়েছে। বরিশালগামী এম এন খান-৭ লঞ্চ থেকে মালামালসহ দুই শিশুকে নিয়ে নেমে আসতে দেখা গেল একজন নারীকে। তাঁর অভিযোগ, ডেকে জায়গা ফাঁকা থাকার পরও লঞ্চের কর্মীরা ছাদে যাওয়ার জন্য বলছেন। তিনি বলেন, ‘নিচের জায়গাগুলো রেখে দিচ্ছে পরে বেশি টাকায় বিক্রি করার জন্য। আমি আগে এসেছি, আমি ছাদে যাব কেন।’

এম এন খান-৭–এ গিয়ে দেখা গেল, নিচতলার ডেকে অনেকটা জায়গা মোটা দড়ি দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। সেখানে কোনো যাত্রীকে বসতে দেওয়া হচ্ছে না। বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে লঞ্চটির কেবিন ইনচার্জ কামরুল দাবি করেন, ভিড় এড়াতেই যাত্রীদের আগে ওপরে যেতে বলা হচ্ছে।

যাত্রীদের ভিড়কে কেন্দ্র করে হকারদের চাপও ছিল পন্টুনে। অনেকেই ইফতার আয়োজন নিয়ে বসেছেন। কেউ বিক্রি করছেন ফল, কেউ রুটি। রয়েছে চপ, পেঁয়াজুও। পানি বিক্রি হচ্ছে দুই ধরনের; ‘ইনটেক’ এবং ‘নরমাল’। জানতে চাইলে বিক্রেতা নারী বলেন, ‘একটা কোম্পানির পানি আরেকটা ফিল্টার থেকে ভরা।’

বিকেল চারটার দিকে ভোলাগামী এমভি শতাব্দী বাঁধন ছাড়ার ঘোষণা আসতেই ১০ নম্বর পন্টুনে হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। যে যেখানে ছিলেন, সেখান থেকেই দৌড়ে লঞ্চ ধরার চেষ্টা করেন। মালামাল হাতে, শিশু কোলে নিয়ে অনেকে শেষ মুহূর্তে ওঠার চেষ্টা করেন। তবে ভিড়ের চাপে বেশির ভাগই উঠতে পারেননি।

লঞ্চ ছেড়ে যাওয়ার পরও ঘাটে অপেক্ষমাণ অসংখ্য যাত্রী। কারও চোখে উদ্বেগ, কারও কণ্ঠে বিরক্তি। তখনই মাইকে ভেসে আসে ‘সকল রুটে পর্যাপ্ত লঞ্চ রয়েছে, কেউ তাড়াহুড়ো করবেন না’। তবে তাতে খুব একটা আশ্বস্ত মনে হয় না তাঁদের। কোলে শিশুসন্তান নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মো. রুবেল বলেন, ‘এতক্ষণ ধরে চেষ্টা করেও লঞ্চে উঠতে পারলাম না। সারা দিনের ভোগান্তি বৃথা গেল।’


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ