জাতীয়
Published : 30 Jan 2026,
সারাদেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রার্থীর লড়াইয়ের কারণে এমনিতেই বিশেষ হয়ে উঠেছে ঢাকার ১২ নম্বর আসনটি, তাতে বাড়তি আকর্ষণ যোগ করেছে মূল আলোচনায় থাকা তিন প্রার্থীর নামের মিল।
তেজগাঁও, হাতিরঝিল ও শেরেবাংলা নগর থানা মিলে গঠিত এই আসনে প্রাথমিক মনোনয়নে বিএনপি সাইফুল আলম নীরবের নাম ঘোষণা করেছিল। কিন্তু শেষমেশ জোটের সমঝোতায় তাকে বাদ দিয়ে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির প্রধান সাইফুল হককে আসনটি ছেড়ে দিয়েছে তারা।
দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে ভোটের মাঠ থেকে সরে দাঁড়াননি নীরব; স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। এই অবাধ্যতার শাস্তি হিসেবে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক এই আহ্বায়ককে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
আবার একই আসনে নির্বাচন করছেন বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের আরেক শরীক গণসংহতি আন্দোলনের নেত্রী তাসলিমা আখতার।
নির্বাচনে জোট এবং বিদ্রোহী প্রার্থীর মধ্যে ভোট ভাগাভাগির এই সুযোগে অনেকটাই নির্ভার আরেক সাইফুল, জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী সাইফুল আলম খান মিলন।
নির্বাচনি আইনের মারপ্যাঁচে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির প্রধানকে নিজস্ব প্রতীক কোদাল নিয়েই লড়তে হচ্ছে। আর স্বতন্ত্র প্রার্থী নীরব পেয়েছেন ফুটবল মার্কা। ফলে ঢাকা-১২ আসনের ব্যালট পেপারে এবার বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকটিই থাকছে না।
এর বিপরীতে জামায়াতের মিলন আছেন ফুরফুরে, প্রতীক দলীয় দাঁড়িপাল্লা দেখিয়েই তিনি ভোট চাইছেন।
ঢাকায় খাদ্যপণ্যের বড় আড়ৎ কাওরান বাজারের পাশাপাশি তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ড, মহাখালী বাসস্ট্যান্ড, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল রয়েছে এই আসনের সীমানায়।
এখানে ধানের শীষের ভোটারদের বিভক্তির মধ্যে দ্বিধায় পড়েছেন স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরাও। তাদের কেউ কেউ জোটের প্রার্থীর পক্ষে প্রচারে নামলেও অনেকে ঝিমিয়ে পড়েছেন, কেউ আবার রয়েছেন বহিষ্কৃত নেতা নীরবের সঙ্গেই।
বিএনপির মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন সাইফুল আলম নীরব, তার প্রতীক ফুটবল।
তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ড এলাকার দোকানদার মোহাম্মদ সুমন বলেন, “এটা আসলে নীরব মিয়ার এলাকা। উনার নাম ঘোষণার পর এলাকা খুব জমজমাট হয়ে উঠছিল। কিন্তু জোটের প্রার্থী আসায় এখন চুপচাপ হয়ে গেছে। বিএনপি সমর্থকরা এখন নীরব। ভাগ ভাগ হয়ে দুই প্রার্থীর পক্ষেই আছে।”
বিএনপি নেতাকর্মীরা ভাগাভাগি হয়ে জোটের প্রার্থীর কোদাল আর বিদ্রোহী ফুটবলের পক্ষে প্রচার চালাচ্ছেন। তাদের কারও স্লোগান, ’ধানের শীষের পক্ষ নিন, কোদাল মার্কায় ভোট দিন’; আর কেউ আওয়াজ তুলছেন, ‘ফুটবল, ফুটবল’।
ছাত্রদল ও যুবদলের রাজনীতি পেরিয়ে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক ছিলেন নীরব। দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নির্বাচনে থাকায় প্রাথমিক সদস্যপদ থেকেই তাকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রায় চারশ মামলা নিয়ে কারাগারে থাকা নীরব আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও খবর হয়েছিলেন।
সেই ধারাবাহিকতায় ৩ নভেম্বর প্রাথমিক মনোনয়নে তাকেই ঢাকা-১২ আসনের প্রার্থী হিসাবে ঘোষণা করেছিল বিএনপি। কিন্তু জোটগত নির্বাচনের কারণে এই আসন ছেড়ে দিতে হয়েছে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হকের জন্য।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকার বিরুদ্ধে আন্দোলনে সক্রিয় থাকা বামপন্থি দলগুলোর জোট গণতন্ত্র মঞ্চের বর্তমান আহ্বায়ক তিনি।
স্থানীয় নেতাদের সমর্থনের উপর ভর করে ধানের শীষের ভোটগুলো কোদাল এবং ফুটবলে ভাগ হবে বলেই মনে করছেন ভোটাররা।
সাবেক কমিশনার আনোয়ারুজ্জামান আনোয়ারের পূর্ণ সমর্থন পাওয়ায় ২৭ নম্বর ওয়ার্ড এবং শেরে বাংলা নগরে ভালো অবস্থায় আছেন সাইফুল হক।
তবে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল সাইফুল আলম নীরবের নিজের এলাকা। সেখানে তার সমর্থন বেশি থাকার কথা বলছেন ভোটাররা।
আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ভোটও একইভাবে ভাগ হওয়ার কথা উঠে এসেছে তাদের কথায়।
নাখালপাড়া এলাকার ভোটার মো. বজ্র মিয়া বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছেন, “ধানের শীষের ভোট দুইপক্ষই পাবে। জামায়াতের নেতাকর্মী, সমর্থকরা ভোট দেবে তাদের প্রার্থীকে।
“আবার আওয়ামী লীগ সমর্থক যারা, তাদের অনেকে কেন্দ্রে যাবে না বলে মনে হচ্ছে। যারা যাবে, তাদের ভোটও ভাগাভাগি হবে।”
ধানের শীষের ভোটে এমন বিভক্তির বিভক্তির প্রভাব যে ভোটের মাঠে পড়তে চলেছে, তা উঠে এসেছে কোদাল এবং ফুটবলের পক্ষে প্রচারে থাকা নেতাদের কথাতেও। তবে দুপক্ষই বেশিরভাগ নেতাকর্মীকে সঙ্গে পাওয়ার দাবি করছে।
সাইফুল হকের নির্বাচনী প্রচারে প্রধান সমন্বয়কারী দায়িত্ব পালন করছেন ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির জ্যেষ্ঠ সদস্য, সাবেক ওয়ার্ড কমিশনার জ্যেষ্ঠ সদস্য আনোয়ারুজ্জামান আনোয়ার।
তিনি বলেছেন, “দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে আমরা কোদালের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছি। বেশি হলে ১০ শতাংশ নেতাকর্মী ওইদিকে আছে। ধানের শীষের ভোট যারা, তারা কোদালে দেবে।”
নীরবের এলাকা তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলে কোদাল মার্কায় ভোট কম পাওয়ার সম্ভাবনার বিষয়ে এক প্রশ্নে তিনি বলেন, “অনেক হয়ত এখন কথা বলছে না, কিন্তু কোদালের দিকে আসবে বলে আমাদের বিশ্বাস। আর অন্যদিকে যারা যাবে তারা যেতে পারে।”
অন্যদিকে ফুটবল প্রতীকের প্রচারের সমন্বয়কারীদের একজন আবু সুফিয়ান দুলাল বলেছেন, নেতাদের মধ্যে বিভক্তি থাকলেও কর্মী-সমর্থকরা নীরবের পক্ষেই আছেন।
“ধরেন, ২০ নেতা থাকলে তাদের বিভক্তি আছে। কিন্তু দুই হাজার কর্মীর মধ্যে ভাগ নাই। সমর্থকদের মধ্যে ভাগ নাই। তার সবাই নীরব ভাইয়ের সঙ্গে আছে।”
ঢাকা মহানগর যুবদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সুফিয়ান দুলাল তেজগাঁও কলেজ ছাত্র সংসদের সাবেক ভিপি।
ঢাকা-১২ আসনে বিএনপি জোটের প্রার্থী বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির প্রধান সাইফুল হক।
এলাকায় স্থানীয় হওয়ার কারণে নীরব বেশি পাবেন বলে দাবি করে দুলাল বলেন, “নীরব ভাই লোকাল ছেলে। ৪৫ বছর ধরে এখানে রাজনীতি করছেন। এখানকার স্থানীয় মানুষকে বাই-নেম চেনেন তিনি। এ কারণে ভোট তিনিই পাবেন।”
বিএনপির বিভক্তির বিপরীতে ঐক্যবদ্ধ জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীরা ভোটারদের কাছে যাচ্ছেন; দলের নারী কর্মীরা সক্রিয় বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচারে।
তেজগাঁও থানা জামায়াতের আমির নোমান আহমদী বলছেন, ধানের শীষের ভোট ভাগাভাগি নিয়ে অত হিসাব কষতে যাচ্ছেন না তারা।
ঢাকা-১২ আসনে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের এই নির্বাচন পরিচালক বলেন, “আমরা আমাদের দিক থেকে এটাকে অত গুরুত্ব দিচ্ছি না। ভোটের এখনও বাকি আছে, শেষ সময়ে অনেক কিছু হতে পারে।
“ধানের শীষের ভোট এক থাকুক বা আলাদা থাকুক, আমরা আমাদের বিজয় নিশ্চিত করতে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।”
জামায়াতের প্রার্থী সাইফুল আলম খান মিলন আশির দশকের শুরুতে ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি ছিলেন। এখন তিনি জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য। এক সময় ইবনে সিনা ট্রাস্টের নির্বাহী পরিচালকও ছিলেন।
নোমান আহমদী বলেন, প্রায় ৩৭ বছর ধরে তেজকুনীপাড়া এলাকায় বসবাস করছেন সাইফুল আলম খান মিলন। স্বেচ্ছাসেবী ও সামাজিক বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে তিনি জড়িত।
এ আসনে এখন পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ পরিবেশে প্রচার চললেও ভোটের ডামাঢোলের মধ্যে পশ্চিম তেজতুরী পাড়ায় স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা আজিজুর রহমান মুছাব্বির এবং পশ্চিম রাজাবাজারে জামায়াতে ইসলামী নেতা আনোয়ারুল্লাহ খুন হয়েছেন।
ঢাকা-১২ আসনে দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী সাইফুল আলম খান মিলন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য।
আইন-শৃঙ্খলা ও মাদকের বিস্তার ছাড়াও গ্যাস ও পানির সংকট আর জলাবদ্ধতাকে এই এলাকার সমস্যা হিসেবে তুলে ধরে তা সমাধানের কথা বলছেন বিভিন্ন প্রার্থী এবং তাদের সমর্থকরা। কারওয়ান বাজার এবং তেজগাঁও ট্রাক স্ট্যান্ডে শৃঙ্খলা ফেরানোর কথাও তারা বলছেন।
ফুটবল প্রতীকের সমর্থক দুলাল বলেন, “সরকারি অনেক খাস জমি আছে। সেখানে ব্যবস্থা করলে রাস্তা থেকে ট্রাক সরানো সম্ভব। তাহলে চলতিপথে মানুষের ভোগান্তি কমে যাবে।”
অন্যদিকে কারওয়ান বাজার, তেজগাঁও ট্রাক্স স্ট্যান্ড এবং মহাখালী বাস টার্মিনাল ঘিরে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলছেন জামায়াতের নোমান আহমদী।
তিনি বলেন, “এই এলাকায় প্রচুর হকার আছে। এখানে অবস্থিত কারওয়ান বাজার, তেজগাঁও ট্রাক স্ট্যান্ড এবং মহাখালী বাসস্ট্যান্ড। এগুলোকে ঘিরে ব্যবসায়ীরা অনেক চাঁদাবাজির শিকার। তারা হয়ত প্রতিবাদমুখর হচ্ছে না, কিন্তু এটা ঘটছে।
“ট্রাকস্ট্যান্ডে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজন যথাযথ ব্যবস্থাপনা এবং এটা করার জন্য একজন অভিভাবক। সেক্ষেত্রে এগুলো নিয়ে আমাদের প্রার্থী তার ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতা থেকে কাজ করবেন।”
>> ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ২৪, ২৫, ২৬, ২৭, ৩৫ এবং ৩৭ আসন মিলিয়ে ঢাকা-১২ আসন।
>> এ আসনের ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৩৩ হাজার ১৩৮ জন।
>> এর মধ্যে ২৪ নম্বর ওয়ার্ডে ৬৩ হাজার ৩৪৩ জন, ২৫ নম্বর ওয়ার্ডে ৬২ হাজার ৫৪৩ জন, ২৬ নম্বর ওয়ার্ডে ৪৬ হাজার ৭৩০ জন, ২৭ নম্বর ওয়ার্ডে ৫৮ হাজার ৫১৯ জন, ৩৫ নম্বর ওয়ার্ডে ৫৫ হাজার ৭৯২ জন এবং ৩৭ নম্বর ওয়ার্ডে ৪৬ হাজার ২১১ জন ভোটার রয়েছেন।
>> মোট ১৫ জন প্রার্থী লড়ছেন ঢাকার এ আসনে, যা সারা দেশে সর্বোচ্চ।
বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের শরীক গণসংহতি আন্দোলনের নেত্রী তাসলিমা আখতারও ঢাকা-১২ আসনে নির্বাচন করছেন।
বিএনপির সমর্থনের বাইরে জোটের শরীক গণসংহতি আন্দোলনের তাসলিমা আখতারও এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। দলীয় প্রতীক মাথাল তার ভোটের মার্কা।
এই আসনে ভোটের মাঠে রয়েছেন নির্বাচন কমিশনের সামনে অনশন করে দলের নিবন্ধন পাওয়া আমজনতার দলের সাধারণ সম্পাদক মোঃ তারেক রহমান। তার প্রতীক প্রজাপতি।
এরে বাইরে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি থেকে কাস্তে মার্কা নিয়ে কল্লোল বণিক, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট থেকে মোমবাতি মার্কা নিয়ে মোহাম্মাদ শাহজালাল মোমবাতি, জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন -এনডিএম থেকে মোমিনুল আমিন সিংহ মার্কায়, জাতীয় পার্টি থেকে লাঙ্গল মার্কায় সরকার মোহাম্মদ সালাউদ্দিন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ থেকে হাতপাখা মার্কা নিয়ে মাহমুদুল হাসান, জনতার দল থেকে কলম মার্কা নিয়ে ফরিদ আহমেদ, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশ থেকে আপেল মার্কা নিয়ে মোছা. সালমা আক্তার, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট (মুক্তিজোট) থেকে ছড়ি মার্কায় মুনতাসির মাহমুদ, গণঅধিকার পরিষদ (জিওপি) থেকে ট্রাক মার্কা নিয়ে আবুল বাশার চৌধুরী, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি থেকে কাঁঠান মার্কা নিয়ে মোহাম্মদ নাঈম হাসান নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ঢাকা-১২ আসনে।