• ঢাকা, বাংলাদেশ রবিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৮:১৮ পূর্বাহ্ন
  • [কনভাটার]
নোটিশ
সারাদেশের জেলা ও উপজেলায় সংবাদকর্মী আবশ্যক। নিজেকে যোগ্য মনে করলে এখনই যোগাযোগ করুন Mob: 01778840333, Email: m.r.01778840333@gmail.com

সারাদেশ চবিতে শিক্ষার্থী-স্থানীয়রা কেন বারবার সংঘর্ষে জড়ায়

sagar crime reporter / ৫২৭ জন দেখেছে
আপডেট : রবিবার, ৩১ আগস্ট, ২০২৫

সারাদেশ

চবিতে শিক্ষার্থী-স্থানীয়রা কেন বারবার সংঘর্ষে জড়ায়

দুপুরে দ্বিতীয় দফায় সংঘর্ষ হয় শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের মধ্যে। রোববার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ২ নম্বর গেট এলাকায়।

প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৫

শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের মধ্যে কয়েক দফায় সংঘর্ষের পর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করেছে হাটহাজারী উপজেলা প্রশাসন। মোতায়েন হয়েছে যৌথবাহিনী। সংঘর্ষের ঘটনা নিয়ে রোববার সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত সবশেষ খবর ছিল এটি। দুই পক্ষের মধ্যে প্রথম দফায় সংঘর্ষ শুরু হয় গতকাল শনিবার মধ্যরাতে, চলে ভোর পর্যন্ত। দ্বিতীয় দফায় রোববার দুপুরে সংঘর্ষ শুরুর পর প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে চলে।

শনিবার রাতে সংঘর্ষ শুরু হয়েছিল ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের এক ছাত্রীকে হেনস্তার ঘটনার জেরে। রাতে ওই ছাত্রী বাসায় পৌঁছালে দারোয়ানের সঙ্গে কথা-কাটাকাটি হয়। এক পর্যায়ে ওই দারোয়ান ছাত্রীকে মারধর করেন বলে অভিযোগ। খবর পেয়ে আরও কয়েকজন শিক্ষার্থী ঘটনাস্থলে গিয়ে ওই দারোয়ানকে ধাওয়া দিলে স্থানীয়দের সঙ্গে সংঘর্ষ শুরু হয়।

ঘটনার শুরু যেভাবে
সাহাবউদ্দিন ভবন নামের ওই বাসাটি ক্যাম্পাসের ২ নম্বর গেটের পাশের মাছ বাজার এলাকায়। এখানকার একটি দোকানের মালিক সাইদুল্লাহ (৫৫)। শনিবার রাতের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী তিনি। রোববার তিনি সমকালের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধিকে বলেন, রাত সাড়ে ১১টার দিকে ওই ছাত্রী বাসায় ঢোকার চেষ্টা করেন। তিনি প্রয়োজনীয় কিছু সামগ্রী কেনার জন্য একটি দোকানে গিয়েছিলেন। বাসায় ফেরার সময় দারোয়ান গেট খুলতে রাজি হচ্ছিলেন না। তখন ওই ছাত্রী চিৎকার করে দারোয়ানকে ডাকাডাকি করেন। ভেতরে থাকা তাঁর সহপাঠীরাও নিচে নেমে আসেন। এক পর্যায়ে তাদের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয়। ওই ছাত্রী ভেতরে ঢোকার জন্য দরজায় আঘাত করলে দারোয়ান এসে তাঁকে মারধর করেন।

সাইদুল্লাহ বলেন, ঘটনার সময় পাশের একটি দোকানে বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন ছাত্র বসে ছিল। তারা চিৎকার শুনে এগিয়ে যায়। এক সময় দারোয়ানকে ধরতে ধাওয়া দেয়। তখন সিএনজিচালিত অটোরিকশার কয়েকজন চালক দারোয়ানকে রক্ষায় এগিয়ে গেলে সংঘর্ষ বাঁধে। দারোয়ান ও অটো চালকরা এই এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা।

দোকান, চাঁদা, ধাক্কায় সংঘর্ষ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস হাটহাজারী উপজেলায়। অনেক শিক্ষার্থী আশপাশের এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে থাকেন। এ ছাড়া, নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে স্থানীয় দোকানগুলোতে যান। অনেক শিক্ষার্থী চট্টগ্রাম শহর থেকে ক্যাম্পাসে আসেন। তাদের বহনের জন্য স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকে অটো রিকশা বা অন্যান্য যানবাহন চালানোর কাজ করেন। এর আগে এসব ঘিরেই শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের মধ্যে বেশ কয়েকবার সংঘর্ষ হয়েছে।

গুগলে ২০২৩ সালের ১ জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত সময় ধরে সার্চ করলে সংঘর্ষের বেশ কয়েকটি ঘটনার বর্ণনা পাওয়া যায়। যেগুলো প্রকাশ হয় বিভিন্ন গণমাধ্যমে।

চলতি মাসের শুরুতে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে স্থানীয়দের সংঘর্ষ হয়েছিল চাঁদা না দেওয়াকে ঘিরে। ৮ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থী রেলস্টেশন এলাকায় একটি দোকান নির্মাণ করতে গেলে স্থানীয় কয়েকজন চাঁদা দাবি করেন। তাদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়েরই একটি বিভাগের অফিস সহকারী ছিলেন। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাদের তর্ক হাতাহাতিতে গড়ায়।

গত বছরের অক্টোবরে সংঘর্ষ হয় দোকান দখল নিয়ে। দোকানটি চালাতেন বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থী। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ অনুযায়ী, স্থানীয় যুবলীগের কয়েকজন নেতা ওই দোকান দখল করতে গেলে তাদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষ হয়। এর জেরে ক্যাম্পাসে ককটেল বিস্ফোরণ ও গুলি ছোড়ার ঘটনা ঘটে। একই বছরের মার্চে সংঘর্ষ হয় দুই মোটরসাইকেলের ধাক্কা লাগা নিয়ে। ২ নম্বর গেট এলাকার বাজারে ইফতারের সামগ্রী কিনতে গিয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের এক কর্মচারী। তিনি আওয়ামী লীগের স্থানীয় একটি ওয়ার্ড কমিটির নেতা ছিলেন। তাঁর মোটরসাইকেলের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর মোটরসাইকেলের ধাক্কা লাগে। পরে এ নিয়ে তাদের মধ্যে কথা-কাটাকাটি শুরু হয়, যা শিক্ষার্থী-স্থানীয়দের সংঘর্ষে গড়ায়।

কারণ আরও গভীরে
শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের বারবার সংঘর্ষে জড়ানোর কারণগুলো নিয়ে রোববার বিকেলে কথা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক দুজন প্রক্টরের সঙ্গে। তারা বলছেন, আপাতদৃষ্টিতে ভাড়া বাসায় থাকা, দোকান থেকে কেনাকাটা, ধাক্কা লাগার মতো তুচ্ছ ঘটনা থেকে সংঘর্ষ শুরু হলেও গভীরে কিছু কারণ আছে। সেগুলো হলো- বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ভৌগোলিক অবস্থান, আবাসন সমস্যা, যাতায়াত ব্যবস্থা, ব্যক্তি পর্যায়ের ইগো বা অহংকার, স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সমন্বয়ের অভাব।

ক্যাম্পাসের ভৌগলিক অবস্থানের একটি বর্ণনা দেন সাবেক প্রক্টর আলী আকবর চৌধুরী। শহর থেকে বেশ দূরের ক্যাম্পাসটি হাটহাজারী উপজেলায় অবস্থিত। শনি ও রোববার যে স্থানে সংঘর্ষ হলো সেই ২ নম্বর গেট এলাকার পাশে ফতেপুর ইউনিয়নের জঙ্গলপট্টি ও জোবরা এলাকা। ক্যাম্পাসের এ অংশে আছে আইন অনুষদ ও চিকিৎসা কেন্দ্র। এসব ঘিরেই স্থানীয়দের অনেকে রিকশা, অটোরিকশা চালানোকে তাদের জীবিকা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। আশপাশে যারা থাকেন তাদের মধ্যে অনেকে যেমন দিনমজুর আবার অনেকে বেশ সম্পদশালী। তাদের অনেকের ভাড়া দেওয়া বাসায় থাকেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।

আলী আকবর চৌধুরী বলছেন, এমন পরিবেশের কারণে অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থী ও স্থানীয়রা পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল। এখান থেকেই মাঝেমধ্যে তাদের বোঝাপড়ার অভাব দেখা দেয়। এ ছাড়া, কিছু সংঘর্ষের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, এর পেছনে রাজনীতি ও মাদক ব্যবসার দ্বন্দ্ব আছে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সংখ্যা প্রায় সাড়ে ২৭ হাজার। বিপরীতে হল আছে ১৪টি। এরমধ্যে ছাত্রদের ৯ ও মেয়েদের ৫টি। ২০০৩ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত প্রক্টরের দায়িত্বে ছিলেন অধ্যাপক আল আমিন। তিনি বলছেন, আবাসন সংকটই নানা সমস্যার সূত্রপাত ঘটায়। প্রথমত, শিক্ষার্থীরা ভাড়া বাসা বা মেসে থাকতে বাধ্য হয়। সেখানে তাদের সঙ্গে নানা ইস্যুতে স্থানীয়রা কথা-কাটাকাটিতে জড়ায়। শিক্ষার্থীরা আবেগপ্রবণ হওয়ার কারণে কিছু ক্ষেত্রে তুচ্ছ বিষয়ও এড়িয়ে যেতে চায় না। স্থানীয়দের অনেকে সামাজিক মর্যাদাগত কারণে শিক্ষার্থীদের প্রতি অতটা সহনশীল হয় না। আবাসন সংকট নিরসনে বিভিন্ন সময় হল নির্মাণের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু চাহিদার বিপরীতে কাজ অতটা আগায়নি।

সাবেক প্রক্টর আল আমিন বলেন, তিনি নিজেও এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। পরিবহন একটি বড় সমস্যা, ছাত্রাবস্থায় নিজেও এর ভুক্তভোগী হন। অনেক শিক্ষার্থী বাইরের এলাকা থেকে ক্যাম্পাসে যাতায়াত করে। ভাড়া নিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে চালকরা তর্কে জড়ায়। সমাধানের জন্য জিরোপয়েন্ট থেকে ক্যাম্পাসের ১ নম্বর গেট পর্যন্ত সরাসরি পরিবহন চালুর উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু তখন বাধা দিয়েছিল স্থানীয় রিকশা চালকরা। তারা সড়কে শুয়ে পড়ে এমন উদ্যোগের প্রতিবাদ জানায়। পরে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের মাধ্যমে তাদের সড়ক থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।

অধ্যাপক আল আমিন বলেন, শুধু এটি নয়। স্থানীয় কিছু মানুষের স্বার্থের বাইরে কোনো সিদ্ধান্ত গেলেই ক্যাম্পাসে যাওয়ার সড়কগুলো অনেক সময় বন্ধ করে দেয়।

সমাধান কী
শিক্ষার্থীরা যখন ক্যাম্পাসের ভেতরে থাকে প্রক্টরিয়াল টিম তাদের নিরাপত্তায় কাজ করে। কিন্তু বাইরে যারা থাকে তাদের ক্ষেত্রে তাৎক্ষনিক নিরাপত্তা দিতে পারে না। তখন স্থানীয় প্রশাসনের ওপর নির্ভর করতে হয়। এ নিয়ে অধ্যাপক আল আমিন ও আলী আকবর চৌধুরী দুজনই একই সুরে কথা বলেছেন।

শনিবার ও রোববারের ঘটনার উদাহরণ দিয়ে আলী আকবর চৌধুরী বলেন, প্রক্টরিয়াল টিমের সঙ্গে স্থানীয় উপজেলা বা পুলিশ প্রশাসন যদি আরও বেশি তৎপরতা দেখাতো তাহলে দ্বিতীয় দফায় সংঘর্ষ হতো না। এখানে নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতির যথেষ্ট ঘাটতি ছিল। তাছাড়া, রাতের ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উচিত ছিল স্থানীয় প্রশাসন ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে নিয়ে বসে দ্রুত সমাধানের দিকে আগানো।

অধ্যাপক আল আমিন বলছেন, আবাসন ও পরিবহন ব্যবস্থার সংকট সমাধানের পাশাপাশি স্থানীয়দের সঙ্গে প্রশাসনের যোগাযোগ আরও বাড়াতে হবে। কোনো ঘটনা ঘটলে দ্রুত যাতে সমাধানের ব্যবস্থা নেওয়া যায় তেমন একটি কাঠামো তৈরি জরুরি। ক্যাম্পাসের বাইরে যেসব শিক্ষার্থী থাকে তারা তো দেশের নাগরিক হিসেবেও নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার রাখে। সুতরাং উপজেলা ও পুলিশ প্রশাসনেরও এগিয়ে আসতে হবে। সমন্বয় না হলে সুষ্ঠু পরিবেশ আনা কঠিন।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সংঘর্ষ পাল্টাপাল্টি হামলা


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ