প্রকাশ: ১৩ জানুয়ারি ২০২৬,
চলতি শিক্ষাবর্ষ থেকে প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য যুগোপযোগী মূল্যায়ন পদ্ধতি প্রস্তুত করেছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। নতুন মানবণ্টনের আওতায় প্রাথমিক স্তর (প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত) শিক্ষার্থীদের দুটি ধারায় মূল্যায়ন করা হবে। একটি হচ্ছে ধারাবাহিক মূল্যায়ন-যেখানে শিক্ষার্থীর দৈনন্দিন শিখন অগ্রগতি, ক্লাসে ও শ্রেণি কাজে সক্রিয় অংশগ্রহণ, ক্লাস টেস্ট ও ভাষাভিত্তিক দক্ষতা নিয়মিতভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে। অপরটি হচ্ছে সামষ্টিক মূল্যায়ন-যেখানে নির্দিষ্ট সময় শেষে শিক্ষার্থীর সার্বিক দক্ষতা ও অর্জন যাচাই করা হবে। এই কাঠামোয় মৌখিক ও ব্যবহারিক পরীক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এতে শিক্ষার্থীদের মুখস্থনির্ভরতার পরিবর্তে বাস্তব জীবনে জ্ঞান প্রয়োগের সক্ষমতা মূল্যায়নের একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে। বাস্তব অভিজ্ঞতা ও বিশেষজ্ঞ মতামতের সমন্বয়েই এই কাঠামো চূড়ান্ত করেছে এনসিটিবি। আজ এই মূল্যায়ন কাঠামো চূড়ান্ত অনুমোদনের সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মুখস্থনির্ভর লিখিত পরীক্ষার পরিবর্তে শিক্ষার্থীর বাস্তব দক্ষতা, শেখার অগ্রগতি ও জ্ঞান প্রয়োগের সক্ষমতা যাচাইয়ের ওপর জোর দেওয়ায় এই উদ্যোগ অত্যন্ত সময়োপযোগী ও শিক্ষার্থীবান্ধব। নতুন মানবণ্টন ও মূল্যায়ন কাঠামো গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার হিসাবে বিবেচনা করা হচ্ছে। যদিও নোট-গাইড ব্যবসায়ীরা এ উদ্যোগের বিরোধিতা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ বিষয়ে এনসিটিবির প্রধান সম্পাদক মুহাম্মদ ফাতিহুল কাদীর যুগান্তরকে বলেন, আমরা মাঠ পর্যায়ে অভিজ্ঞদের দিয়ে যাচাই-বাচাই করে এই মূল্যায়ন পদ্ধতি ঠিক করেছি। বিশেষজ্ঞসহ সংশ্লিষ্টদের মতামতের ভিত্তিতে এটি করা হয়। আমরা ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) আবু নূর মো. শামসুজ্জামান সোমবার যুগান্তরকে বলেন, প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন পদ্ধতির একটি খসড়া তৈরি করেছে এনসিটিবি। এটি নিয়ে কাল (আজ) মন্ত্রণালয়ে একটি সভা রয়েছে। সেখানে এই মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা ও পর্যালোচনা হবে। গুরুতর কোনো আপত্তি না থাকলে চূড়ান্ত অনুমোদনও হয়ে যেতে পারে এই সভায়।
এনসিটিবি সূত্র জানায়, নতুন মানবণ্টনের আওতায় প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের ধারাবাহিক ও সামষ্টিক-দুই ধরনের মূল্যায়নের মাধ্যমে অগ্রগতি নিরূপণ করা হবে। মানবণ্টন প্রণয়নের পুরো প্রক্রিয়ায় মাঠপর্যায়ের শ্রেণিশিক্ষক ও প্রধান শিক্ষক থেকে শুরু করে পিটিআই ও ইউআরসি ইনস্ট্রাক্টর, সহকারী থানা শিক্ষা কর্মকর্তা, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর, জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমি, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, এনসিটিবি ও জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটির (এনসিসিসি) সদস্যসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। তাদের প্রস্তাব ও বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই চূড়ান্ত করা হয়েছে এই মূল্যায়ন কাঠামো।
অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি জিয়াউল কবির দুলু যুগান্তরকে বলেন, নতুন মানবণ্টনে মুখস্থনির্ভর পরীক্ষার পরিবর্তে শিক্ষার্থীর প্রকৃত শেখা, দক্ষতা ও প্রয়োগ ক্ষমতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ধারাবাহিক মূল্যায়নের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর দৈনন্দিন শিখন অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা যাবে এবং সামষ্টিক মূল্যায়নের মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময় শেষে শিক্ষার্থীর সার্বিক দক্ষতা নিরূপণ সম্ভব হবে। বিশেষ করে মৌখিক ও ব্যবহারিক পরীক্ষার অন্তর্ভুক্তি শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি করবে এবং বাস্তব জীবনে জ্ঞান প্রয়োগে সহায়তা করবে। এই মানবণ্টনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো-ভাষা দক্ষতা ও ক্লাস টেস্টের ওপর গুরুত্ব আরোপ। নিয়মিত ক্লাস টেস্ট ও ভাষাভিত্তিক মূল্যায়নের ফলে শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষের পাঠে আরও মনোযোগী হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীদের পড়ালেখা ভীতি কমে গিয়ে শেখার প্রতি আগ্রহ ও আনন্দ বাড়বে।
নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতির কাঠামোতে দেখা গেছে, যেসব বিষয়ে শিক্ষার্থীরা পাঠ্যপুস্তক পেয়ে থাকে, সেগুলোতে ১০০ নম্বরে; যেসব বিষয়ে পাঠ্যপুস্তক নেই, শুধু শিক্ষক সহায়িকার ভিত্তিতে পাঠদান করা হয়ে থাকে-সেসব বিষয়ে শিক্ষার্থীদের ৫০ নম্বরে মূল্যায়ন করা হবে। ১০০ নম্বরের ক্ষেত্রে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে ধারাবাহিক মূল্যায়ন হবে ৫০ নম্বরে। আবার সামষ্টিক মূল্যায়ন হবে ৫০ নম্বরে। তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণিতে ধারাবাহিক মূল্যায়ন হবে ৩০ নম্বরে। সামষ্টিক মূল্যায়ন ৭০ নম্বরে।
ঢাকার মনিপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক মোস্তাফিজুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, এই মূল্যায়ন ব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষকদের জন্যও সহায়ক হবে। কারণ, ধারাবাহিক মূল্যায়নের মাধ্যমে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীর দুর্বলতা দ্রুত শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে পারবেন। ফলে শিক্ষার্থীর শিখন ঘাটতি পূরণ সহজ হবে এবং শ্রেণিকক্ষভিত্তিক শিক্ষার মান উন্নত হবে।








