• ঢাকা, বাংলাদেশ রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৫৬ অপরাহ্ন
  • [কনভাটার]
নোটিশ
সারাদেশের জেলা ও উপজেলায় সংবাদকর্মী আবশ্যক। নিজেকে যোগ্য মনে করলে এখনই যোগাযোগ করুন Mob: 01778840333, Email: m.r.01778840333@gmail.com

সুউচ্চ ভবনে বদলে যাচ্ছে ঢাকার আকাশরেখা

sagar crime reporter / ৯ জন দেখেছে
আপডেট : রবিবার, ১১ অক্টোবর, ২০২৬

সুউচ্চ ভবনে বদলে যাচ্ছে ঢাকার আকাশরেখা

গত শতাব্দীতে নির্মিত ৩১ তলাবিশিষ্ট বাংলাদেশ ব্যাংক ভবনের উচ্চতা ৪৫০ ফুট। চলতি শতাব্দীতে বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু ভবন সিটি সেন্টার, যার উচ্চতা ৫৬১ ফুট। বর্তমানে ঢাকায় ৫০০ ফুট উচ্চতার একাধিক ভবন আছে। শান্তা পিনাকেলের প্রথম ৪০ তলা ভবন।

 

দেড় দশক আগেও ঢাকার স্কাইলাইন (আকাশরেখা) ছিল অনেকটাই সাদামাটা। তখন ২০ তলা বা এর বেশি উঁচু ভবনের সংখ্যা ছিল হাতে গোনা। তবে আবাসন কোম্পানির মধ্যে চেষ্টা ছিল। ফলে গড়ে উঠতে থাকে আধুনিক ধারার নিত্যনতুন আবাসন প্রকল্প। সেই ধারাবাহিকতায় এখন নতুনত্ব দেখা যাচ্ছে ঢাকার স্থাপত্যে।

ঢাকায় এখন ৪০ তলা ভবন উঠেছে আকাশের দিকে। সমসাময়িক সময়ে প্রায় একই উচ্চতার ভবন আরও কয়েকটি হচ্ছে। এখানে আধুনিক সুযোগ–সুবিধার সন্নিবেশ ঘটিয়েছে আবাসন প্রতিষ্ঠানগুলো। নিরাপত্তা নিশ্চিতেও প্রযুক্তির ব্যবহার করছে তারা। এতে ভবনগুলোতে বাসিন্দারা জীবনযাপন ও কর্মক্ষেত্রে নতুন অভিজ্ঞতা পাচ্ছেন।

শুধু উঁচু দালান নয়, পরিবেশবান্ধব আবাসন প্রকল্পও হচ্ছে। সেখানে সবুজের সমারোহের পাশাপাশি দিনে সূর্যের আলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার, জ্বালানিসাশ্রয়ী আলোকসজ্জা, পানির অপচয় হ্রাস এবং শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ব্যবহার কমানোর মাধ্যমে প্রাকৃতিক সম্পদ ও পরিবেশের ওপর চাপ কমানোর চেষ্টা চলছে।

আবাসন খাতের একাধিক উদ্যোক্তা বলছেন, এক দশক আগেও ৫ বা ১০ কাঠার প্লটে বেশির ভাগ আবাসন প্রকল্প হতো। এখন পাশাপাশি থাকা কয়েকটি জমির মালিক মিলে আবাসন কোম্পানির কাছে যাচ্ছেন। এতে ৮০–৯০ কাঠা বা এর চেয়ে বড় জায়গায় বৃহৎ আবাসন প্রকল্প নির্মাণের সুযোগ তৈরি হয়েছে। ফলে অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব প্রকল্প নির্মিত হচ্ছে।

জানতে চাইলে আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিহ্যাবের সভাপতি আলী আফজাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাংলাদেশে ১৮ কোটি মানুষ বসবাস করে। ২০৩৫ সালে জনসংখ্যা বেড়ে ২৫ কোটি হতে পারে। তখন সরকারকে দুটি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। এক. বিপুলসংখ্যক মানুষের খাদ্যের সংস্থান এবং দুই. আবাসনের চাহিদা মেটানো। এমন প্রেক্ষাপটে আমাদের সুউচ্চ ভবন করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। এসব ভবন পরিবেশবান্ধব হিসেবেও নির্মাণ করা যায়। মাথা গোঁজার জন্য উঁচু ভবন করা না গেলে কৃষিজমি থাকবে না। সে জন্য দু–চারটি ব্যতিক্রম ছাড়া উঁচু ভবন করার ক্ষেত্রে সব ধরনের বিধিনিষেধ তুলে দেওয়া দরকার। এ ক্ষেত্রে গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, অগ্নিনির্বাপণ ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা সরকারকে করতে হবে।’

একটি পরিকল্পিত শহরে হাইরাইজ এলাকা সাধারণত ৫ শতাংশেরও কম থাকে। তাই যত্রতত্র ছোট প্লটের পরিবর্তে কেবল সুনির্দিষ্ট স্থানে ব্লক ডেভেলপমেন্টের মাধ্যমেই টেকসই উঁচু ভবন নির্মাণ করা সম্ভব।

আদিল মুহাম্মদ খান সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) ও অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

ঢাকায় বাড়ছে উঁচু ভবন

বিভিন্ন দেশ পাল্লা দিয়ে একের পর এক আকাশচুম্বী ভবন নির্মাণ করছে। ঢাকায়ও এখন উঁচু ভবন তৈরির প্রবণতা বাড়ছে। তবে বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু ভবন দুবাইয়ের বুর্জ খলিফার পাঁচ ভাগের এক ভাগ উচ্চতার ভবন নির্মিত হয়েছে ঢাকায়।

আবাসন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা জানান, একসময় সুউচ্চ ভবন কেবলই জায়গার সর্বোচ্চ ব্যবহারের মাধ্যম ছিল, কিন্তু আজ তা আধুনিক জীবনধারা, আভিজাত্য এবং আন্তর্জাতিক মানের কর্মপরিবেশের প্রতীক হয়ে উঠেছে। কারণ, এসব ভবনে সর্বাধুনিক লিফট প্রযুক্তি, স্মার্ট বিল্ডিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (বিএমএস), শক্তিসাশ্রয়ী কেন্দ্রীয় এসি, সুপরিসর পার্কিং এবং পরিবেশবান্ধব ফিচার থাকছে।

দেশে সুউচ্চ ভবন নির্মাণ শুরু হয় স্বাধীনতার আগে। পূর্ব পাকিস্তানে সবচেয়ে উঁচু ভবন হিসেবে দিলকুশায় জীবন বীমা টাওয়ারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। এটির উচ্চতা প্রায় ৮৫ মিটার। দেশ স্বাধীনের পর নির্মাণকাজ শেষ হয়। পরবর্তী সময়ে ১০০ মিটারের কাছাকাছি উচ্চতায় বেশ কিছু ভবন নির্মিত হয়। গত শতাব্দীতে নির্মিত ৩১ তলাবিশিষ্ট বাংলাদেশ ব্যাংক ভবনের উচ্চতা ৪৫০ ফুট। চলতি শতাব্দীতে বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু ভবন সিটি সেন্টার, যার উচ্চতা ৫৬১ ফুট।

বর্তমানে ঢাকায় ৫০০ ফুট উচ্চতার বেশ কয়েকটি ভবনের নির্মাণকাজ চলছে। এর মধ্যে শান্তা পিনাকেলের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। এটি দেশের প্রথম ৪০ তলা ভবন। এ ছাড়া ঢাকা টাওয়ার, ট্রপিক্যাল হোমসের টিএ টাওয়ার, সেনাকল্যাণ কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টসের এসকেএস স্কাইরিচ ও মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের এমজিআই টাওয়ারের নির্মাণকাজ চলছে। টিএ টাওয়ার মালিবাগে আর বাকিগুলো তেজগাঁও-গুলশান লিংক রোডে। সব ভবনই বাণিজ্যিক।

জানতে চাইলে শান্তা হোল্ডিংস লিমিটেডের প্রধান বিক্রয় কর্মকর্তা (সিএসও) শিহাব আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা ভবনের শৈল্পিক নান্দনিকতার পাশাপাশি কাঠামোগত নিরাপত্তা ও স্থায়িত্বকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে থাকি। সুউচ্চ ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে ভূমিকম্প ও বায়ুচাপের ঝুঁকি মোকাবিলায় আমরা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড, উইন্ড টানেল টেস্ট এবং বিশ্বখ্যাত প্রকৌশলীদের পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করি।’

নগর–পরিকল্পনাবিদদের সংগঠন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাবেক সভাপতি ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান প্রথম আলোকে জানান, দেশে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ও ব্লক ডেভেলপমেন্টের নিয়ম না মেনেই যত্রতত্র উঁচু ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে, যা শহরের ঝুঁকি ও জনঘনত্ব মারাত্মকভাবে বাড়াচ্ছে।

অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খানের মতে, ঢাকা শহরে মিডরাইজ (মাঝারি উচ্চতার) ভবনেই সর্বোচ্চ জনঘনত্ব তৈরি হয়েছে। অথচ বছিলা বা কাঁঠালবাগানের মতো এলাকায় ৮-১০ ফুট সরু রাস্তার পাশে ছোট প্লটে ১৪ তলা ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। ফায়ার ফাইটিংয়ের সুযোগ না থাকায় এসব ভবনে অগ্নিঝুঁকি বাড়ছে এবং পর্যাপ্ত আলো-বাতাস না থাকায় একপর্যায়ে বস্তিসুলভ পরিবেশ তৈরি হবে। অন্তত এক একর জমিতে চারপাশে পর্যাপ্ত ফাঁকা জায়গা ও সবুজায়ন রেখে ব্লক ডেভেলপমেন্টের মাধ্যমে উঁচু ভবন করা উচিত। সিঙ্গাপুরে দুটি সুউচ্চ ভবনের মাঝে ৫০-৭০ মিটার ফাঁকা থাকে, অথচ আমাদের দেশে তা মাত্র ৫-১০ মিটার।

আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, একটি পরিকল্পিত শহরে হাইরাইজ এলাকা সাধারণত ৫ শতাংশেরও কম থাকে। তাই যত্রতত্র ছোট প্লটের পরিবর্তে কেবল সুনির্দিষ্ট স্থানে ব্লক ডেভেলপমেন্টের মাধ্যমেই টেকসই উঁচু ভবন নির্মাণ করা সম্ভব।

পরিবেশবান্ধব ভবন হচ্ছে

পরিবেশবান্ধব পোশাক কারখানা স্থাপনে বিশ্বে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। সেই ধারাবাহিকতায় আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবনও পরিবেশবান্ধব হিসেবে গড়ে তুলতে শুরু করেছে আবাসন প্রতিষ্ঠানগুলো। এসব ভবনে প্রাকৃতিক আলো–বাতাসের চলাচল এবং বিশেষ গ্লাস ব্যবহারের কারণে বিদ্যুৎ সাশ্রয় হচ্ছে। ভেতরে খোলামেলা পরিবেশ বাসিন্দাদের নতুন অভিজ্ঞতা দিচ্ছে।

৪ অক্টোবর গুলশানে পরিবেশবান্ধব বাণিজ্যিক ভবন সিম্পল ট্রি জিএসআরে সিম্পল ট্রি গ্রুপের কার্যালয়ে প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার স্থপতি মোহাম্মদ ফয়েজ উল্লাহর সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, ভবনটির নকশা এমনভাবে করা হয়েছে, যাতে দিনের অধিকাংশ সময় সূর্যের আলো ব্যবহার করে কাজকর্ম করতে পারেন বাসিন্দারা। তা ছাড়া দ্বিস্তরবিশিষ্ট বিশেষ কাচ লাগানো হয়েছে। এতে ভেতরটা তুলনামূলক কম গরম হয়। এর ফলে সাধারণ ভবনের তুলনায় শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) কম চালাতে হয়। এতে ১৫–২০ শতাংশ বিদ্যুৎ সাশ্রয় হচ্ছে ভবনে।

মোহাম্মদ ফয়েজ উল্লাহ বলেন, বর্তমান সময়ে যেসব আধুনিক ভবন নির্মিত হচ্ছে, তার সঙ্গে বাড়তি ১–২ শতাংশ অর্থ ব্যয় করলে পরিবেশবান্ধব ভবন নির্মাণ সম্ভব।

প্রণোদনা দিলে উৎসাহ বাড়বে

দেশের আবাসনসংকট সমাধানে সুউচ্চ ভবন নির্মাণ বড় সমাধান হতে পারে বলে মনে করেন রিহ্যাবের সাবেক সভাপতি ও বিল্ডিং ফর ফিউচারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তানভীরুল হক প্রবাল। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের জমির স্বল্পতা প্রকট। ফলে উঁচু ভবনই সমাধান। সে জন্য যথাযথ নীতিমালা করতে হবে। বেসরকারি আবাসন প্রতিষ্ঠান আধুনিক ভবন নির্মাণ করবে। তবে গ্যাস–বিদ্যুৎ, গণপরিবহনসহ অন্যান্য নাগরিক সুযোগ–সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে সরকারকে।’

পরিবেশবান্ধব ভবন নির্মাণ এখনো ব্যয়বহুল উল্লেখ করে তানভীরুল হক প্রবাল বলেন, সরকার যদি কোনোভাবে প্রণোদনা দেয়, তাহলে পরিবেশবান্ধব ভবন নির্মাণে উৎসাহ বাড়বে। না হলে পরিবেশবান্ধব আবাসিক ভবন অনেকের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকবে না। সে জন্য পরিবেশবান্ধব ভবন নির্মাণ জনপ্রিয় করতে হলে সরকারকে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে হবে বলে মনে করেন তিনি।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ