ঢাকার যানজট নিরসন ও দ্রুত যাতায়াত নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি নিয়ে বিমানবন্দরের কাওলা থেকে তেজগাঁও পর্যন্ত চালু হয়েছিল ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে। রাজধানীর বিমানবন্দর এলাকা থেকে কুতুবখালী পর্যন্ত বিস্তৃত এই আধুনিক সড়ক অবকাঠামো নগরবাসীর জন্য স্বস্তির প্রতীক হয়ে উঠবে এমন প্রত্যাশাই ছিল সবার। কিন্তু বাস্তব চিত্র এখন অনেকটাই ভিন্ন। বিশেষ করে তেজগাঁও টোল প্লাজাতে ম্যানুয়ালি টোল আদায়, পর্যাপ্ত লেন চালু না থাকা এবং প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে প্রতিদিন দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে হাজারো যানবাহনকে। এতে সময় অপচয়ের পাশাপাশি বাড়ছে জ্বালানি খরচ, সৃষ্টি হচ্ছে জনভোগান্তি ও ক্ষোভ।
বিশেষ করে তেজগাঁও টোল প্লাজাতে দীর্ঘ যানজটের ঘটনা নিয়মিত হয়ে উঠেছে। চালকদের অভিযোগ, টোল আদায়ে এখনো পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালু হয়নি। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ম্যানুয়ালি টাকা নেয়া হচ্ছে। রসিদ দেওয়া হচ্ছে হাতে হাতে। ফলে প্রতিটি গাড়ি পার হতে সময় লাগছে অনেক বেশি। আবার কোনো কোনো সময় একটি বা একাধিক টোল লেন বন্ধ থাকায় পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠছে।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার গাড়ি এই এক্সপ্রেসওয়ে ব্যবহার করে। অফিসগামী মানুষ, যানবাহন, অ্যাম্বুলেন্স, ব্যক্তিগত গাড়ি ও গণপরিবহনসব মিলিয়ে টোল প্লাজাগুলোতে ব্যাপক চাপ তৈরি হয়। অথচ সেই চাপ সামাল দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেই বলে অভিযোগ ব্যবহারকারীদের।
সোমবার সকালে টোল প্লাজায় গিয়ে দেখা যায়, এক্সপ্রেসওয়েতে উঠার সময় গাড়ির লাইন দাঁড়িয়ে আছে। ব্যক্তিগত গাড়ি, মাইক্রোবাস, বাস, ধরনের যানবাহন ধীরগতিতে এগোচ্ছে। অনেক চালক গাড়ি থেকে নেমে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। কেউ কেউ বিরক্ত হয়ে হর্ন বাজাচ্ছেন। যানজটের অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে টোল আদায়ের একটি লেন বন্ধ থাকার বিষয়টি। ফলে সব যানবাহনকে সীমিত কয়েকটি লেন দিয়ে পার হতে হচ্ছে।
যাত্রীরা বলছেন, এক্সপ্রেসওয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে এ ধরনের অব্যবস্থাপনা মেনে নেওয়া যায় না। কারণ মানুষ অতিরিক্ত টোল দিচ্ছে মূলত সময় বাঁচানোর জন্য। কিন্তু বাস্তবে সেই সুবিধা মিলছে না।
গাড়িচালক শাকিল বলেন, এক্সপ্রেসওয়েতে উঠেছিলাম দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য। কিন্তু টোল দিতে গিয়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে। তাহলে লাভ কী হলো? প্রতিদিন এই রুটে যাই। সকালে অফিস টাইমে টোল প্লাজার কাছে এসে আটকে যেতে হয়। এছাড়া টোল প্লাজায় লেন বন্ধ। কয়েকজন লোক এসে গাড়ি থেকে টোলের টাকা নিয়ে যায়। এতে সময় লাগে। আর ম্যানোয়ালি টোল আদায় করলে বেশি করে লোকবল নিয়োগ দেয়া হোক। তাহলে এই পথে চলাচলকারীদের ভোগান্তি কমবে।
একটি প্রাইভেটকারের চালক সোহান বলেন, টোল প্লাজার সামনে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার কারণে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ জ্বালানি অপচয় হচ্ছে। এক্সপ্রেসওয়ের লক্ষ্য ছিল দ্রুত চলাচল নিশ্চিত করা। কিন্তু যদি গাড়ি দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকে তাহলে সময় নষ্ট হয়ে যায়। এক্সপ্রেসওয়ের টোল তুলনামূলক বেশি হলেও সেবার মান সে অনুযায়ী নয়। সময় বাঁচানোর জন্যই এক্সপ্রেসওয়ে ব্যবহার করি। কিন্তু টোল প্লাজায় আটকে থাকতে হলে লাভ কোথায়?
নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, বিশ্বের বড় বড় শহরে টোল প্লাজা এখন প্রায় পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয়। গাড়ি থামানো ছাড়াই টোল কাটা হয়। কিন্তু আমাদের এখানে এখনো নগদ লেনদেনের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এটি সময়সাপেক্ষ এবং যানজট বাড়ানোর অন্যতম কারণ। যে অবকাঠামো যানজট কমানোর কথা, সেটির কারণেই যদি নতুন যানজট সৃষ্টি হয় তাহলে পুরো প্রকল্পের কার্যকারিতা প্রশ্নের মুখে পড়ে।
ঢাকা এলিভেটেড এ´প্রেসওয়ের অপারেশন ও মেইনটেনেন্স কোম্পানি লিমিটেডের যানচলাচল, সুরক্ষা ও নিরাপত্তা বিভাগের পরিচালক ক্যাপ্টেন (অব.) হাসিব হাসান খান ইনকিলাবকে বলেন, হয়তো কোনো জরুরি কাজের জন্য লেন বন্ধ রাখা হয়েছে। আর কোনো লেন বন্ধ থাকলে স্বাভাবিকভাবেই টোল প্লাজায় যানবাহনের জটলা সৃষ্টি হয়।