• ঢাকা, বাংলাদেশ সোমবার, ১৮ মে ২০২৬, ০২:২২ অপরাহ্ন
  • [কনভাটার]
নোটিশ
সারাদেশের জেলা ও উপজেলায় সংবাদকর্মী আবশ্যক। নিজেকে যোগ্য মনে করলে এখনই যোগাযোগ করুন Mob: 01778840333, Email: m.r.01778840333@gmail.com

সড়ক প্রকল্পের টাকায় ভবনবিলাস

sagar crime reporter / ১২ জন দেখেছে
আপডেট : সোমবার, ১৮ মে, ২০২৬

জাতীয়

সড়ক প্রকল্পের টাকায় ভবনবিলাস

 

বিদেশ থেকে ঋণ নেওয়া হয়েছিল টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা থেকে রংপুর পর্যন্ত মহাসড়ক সম্প্রসারণের জন্য। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে এই প্রকল্পে যুক্ত করা হয় গবেষণাগার উন্নয়নের নামে ভবন নির্মাণসহ নানা বিলাসী উপকরণ। যেমন মাল্টিপারপাস হল, সেমিনার হল, কনফারেন্স হল, লাউঞ্জ, দেড় শতাধিক পাঁচ তারকা হোটেলের সমমানের থাকার কক্ষ। আরও যোগ হয়েছে সুইমিংপুল, জিমনেসিয়াম, ইনডোর গেমস সরঞ্জাম বিলিয়ার্ড, স্নুকার, কার্ড রুম ইত্যাদি।

সবই করা হচ্ছে বড় বড় গাছ কেটে, পুকুর ভরাট করে। বর্তমান সরকার সারা দেশে বৃক্ষরোপণে জোর দিয়েছে। অথচ সরকারেরই একটি সংস্থা গাছ কেটে বিলাসী ভবন তৈরি করছে।

প্রকল্পটি সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের। প্রকল্পটির নাম সাসেক সড়ক সংযোগ প্রকল্প-২। আর বিলাসী ভবনগুলোর নির্মাণকাজ চলছে মিরপুরের পাইকপাড়ায় সড়ক গবেষণাগার এলাকায়। জায়গাটি মূল সড়ক থেকে ভেতরে, গাছগাছালিতে ঘেরা। এখানে নতুন ভবন নির্মাণ করতে ভাঙা হয়েছে পুরোনো স্থাপত্যশৈলীর ভবন। এগুলোর নকশা করেছিলেন স্থপতি মাজহারুল ইসলাম।

সবই করা হচ্ছে বড় বড় গাছ কেটে, পুকুর ভরাট করে। বর্তমান সরকার সারা দেশে বৃক্ষরোপণে জোর দিয়েছে। অথচ সরকারেরই একটি সংস্থা গাছ কেটে বিলাসী ভবন তৈরি করছে।

প্রকল্পে বিলাসী উপকরণ যোগ হওয়ার সঙ্গে বেড়েছে ব্যয়ও। শুরুতে এসব ভবন ও কিছু যন্ত্রপাতি কেনার জন্য ঠিকাদার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স (এনডিই) নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে। শুরুতে তারা কাজটি পেয়েছিল ২৩২ কোটি টাকায়। তিন দফা ব্যয় বাড়িয়ে এখন ৩৩৫ কোটি টাকায় ঠেকেছে।

সওজের দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, ঠিকাদার সওজের প্রাক্কলনের চেয়ে সাড়ে ১৩ শতাংশ ছাড়ে (লেস) মূল্য প্রস্তাব করে কাজটি পান। অনেক উপকরণের (আইটেম) মূল্য কম দেখিয়ে কাজটি বাগিয়ে নেন। কিন্তু পরে যেসব আইটেমের মূল্য কম দেখানো হয়েছিল, এর বেশির ভাগই বাদ দেওয়া হয়। আর নতুন নতুন পণ্য ও কাজ যোগ করা হয়, যেগুলোর মূল্য বেশি। মূলত বাড়তি লাভের জন্যই এই কারসাজি করেছেন ঠিকাদার। কর্তৃপক্ষও তা অনুমোদন করেছে। সব মিলিয়ে ঠিকাদার কাজ নেওয়ার পর কৌশল করে প্রায় ৪৫ শতাংশ ব্যয় বাড়িয়েছেন, যা খুবই অস্বাভাবিক।

হাতিরঝিলে দৃষ্টিনন্দন ভবন

ঢাকার তেজগাঁওয়ে হাতিরঝিলের পাশেই ২০২৩ সালের শেষের দিকে সওজের নতুন প্রধান কার্যালয় উদ্বোধন করা হয়। আধুনিক নকশা এবং দৃষ্টিনন্দন এই ভবন যে কারও নজর কাড়বে। এর পাশেই আরেকটি গোলাকার দৃষ্টিনন্দন ভবন তৈরি করা হয় একই সময়। এটির একাংশ ব্যবহার করে সওজ, অন্য অংশ ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ)। দুটি ভবনই ১৩ তলাবিশিষ্ট।

এই প্রধান কার্যালয়ে ৭০০ আসনবিশিষ্ট মিলনায়তনসহ বিভিন্ন আকারের সম্মেলনকক্ষ, বড় মসজিদ, পাবলিক প্লাজা, পাঠাগার, ক্যাফেটেরিয়া, ডে কেয়ার সেন্টার, ২০০ গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা আছে। সব মিলিয়ে দুটি ভবন নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৩৩৫ কোটি টাকা। দুটি ভবনে এক হাজারের মতো কর্মকর্তা-কর্মচারীর কক্ষ ও বসার জায়গা রয়েছে। অন্যদিকে সওজের গবেষণাগারে সাকল্যে লোকবল আছে ৫০ জনের মতো। তারপরও খরচ করা হচ্ছে দুই ভবনের সমান টাকা।

দৃষ্টিনন্দন ভবন থাকা সত্ত্বেও নতুন করে বিলাসী ভবন নির্মাণের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, সড়ক ভবনে সেমিনার হলসহ অন্যান্য সুবিধা থাকার পরও নতুন করে একই ধরনের বিলাসী স্থাপনা করার যৌক্তিকতা নেই। প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানোর এটা একটা কৌশল। বিগত আমলে এগুলো স্বাভাবিক হয়ে পড়েছিল। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার ও বর্তমান বিএনপি সরকারের আমলে এই ধারা অব্যাহত রাখা খুবই হতাশাজনক।

সওজের এই প্রধান কার্যালয়ে ৭০০ আসনবিশিষ্ট মিলনায়তনসহ বিভিন্ন আকারের সম্মেলনকক্ষ, বড় মসজিদ, পাবলিক প্লাজা, পাঠাগার, ক্যাফেটেরিয়া, ডে কেয়ার সেন্টার, ২০০ গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা আছে। সব মিলিয়ে দুটি ভবন নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৩৩৫ কোটি টাকা। দুটি ভবনে এক হাজারের মতো কর্মকর্তা-কর্মচারীর কক্ষ ও বসার জায়গা রয়েছে। অন্যদিকে সওজের গবেষণাগারে সাকল্যে লোকবল আছে ৫০ জনের মতো। তারপরও খরচ করা হচ্ছে দুই ভবনের সমান টাকা।

ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, এশিয়া ও ইউরোপের অনেক দেশের চেয়ে বাংলাদেশে অবকাঠামো নির্মাণ ব্যয় কয়েক গুণ বেশি এমনি এমনি হয়নি। বিলাসী ব্যয়, যোগসাজশ করে উপকরণ কমানো-বাড়ানো—এভাবেই ব্যয় বাড়ে। প্রকল্প কর্তৃপক্ষ থেকে শুরু করে মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা কমিশন, মন্ত্রিসভা কমিটি থেকে কীভাবে এগুলো পাস হয়, তা বড় প্রশ্ন। নিশ্চয়ই বিভিন্ন স্তরে সুবিধাভোগী রয়েছে। স্বাধীন তৃতীয় পক্ষ দিয়ে এগুলো তদন্ত করা উচিত। একই সঙ্গে ঋণদাতা সংস্থাও দায় এড়াতে পারে না বলে তিনি মনে করেন।

সওজ সূত্র জানায়, মিরপুরের গবেষণাগারে বিলাসী স্থাপনা নির্মাণসহ দুটি প্যাকেজের কাজ পাওয়া এনডিই বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১৭ সালের শেষ দিকে সওজে ঠিকাদারি শুরু করে। পরবর্তী ছয় বছরে তারা সড়কে একক ও যৌথভাবে সাড়ে আট হাজার কোটি টাকার ঠিকাদারি পেয়েছে, যা মোট কাজের ১০ শতাংশ। অন্য কোনো ঠিকাদার এত কাজ পাননি।

সওজ অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, এনডিই ঠিকাদারি কাজ পেতে আওয়ামী লীগ সরকারের সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করত। ওবায়দুল কাদের কর্মকর্তাদের বলে দিয়েছিলেন যে প্রতিষ্ঠানটির পেছনে রয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সামরিক উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিক। এমনকি শেখ হাসিনার বোন শেখ রেহানারও পরিচয় দিতেন প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধারেরা।

এনডিইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক রায়হান মুস্তাফিজ। বক্তব্য জানতে তাঁকে ফোন করা হলে তিনি ধরেননি। খুদে বার্তা দেওয়ার পরও সাড়া দেননি।

চীনে একই ধরনের সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে অর্ধেক খরচে। তুরস্কে এক কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণে যে খরচ হয়, বাংলাদেশে হয়েছে এর প্রায় চার গুণ।

সাসেক-২ প্রকল্পটি কী

সাসেক হলো দক্ষিণ এশীয় উপ-আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা। টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা থেকে রংপুর পর্যন্ত ১৯০ কিলোমিটার মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার লক্ষ্যে নেওয়া হয় সাসেক সড়ক সংযোগ প্রকল্প-২। শুরুতে ব্যয় ধরা হয়েছিল ১১ হাজার ৮৯৯ কোটি টাকা। তিন দফা ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯ হাজার ৫৬ কোটি টাকা। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে। তারা ১১ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ দিচ্ছে। এই প্রকল্পের আওতায় মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করা, দুই পাশে স্থানীয় যাতায়াতের জন্য সড়ক নির্মাণ, বেশ কিছু উড়ালসড়ক ও সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে।

প্রতি কিলোমিটার মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করতে ব্যয় হচ্ছে ২০০ কোটি টাকার বেশি। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দেশে সড়ক ও সেতু নির্মাণে বিপুল ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিবিষয়ক শ্বেতপত্র প্রণয়নে কমিটি করা হয়। কমিটি প্রতিবেদন জমা দেয় ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে।

শ্বেতপত্রে দেখানো হয়েছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাংলাদেশে প্রতি কিলোমিটার চার লেনের মহাসড়ক নির্মাণে খরচ হয়েছে গড়ে ৬৩ দশমিক ৫ কোটি ডলার, যা ভারতের তুলনায় ৪ দশমিক ৪ গুণ বেশি। এ ধরনের সড়ক নির্মাণে পাকিস্তানের চেয়ে বাংলাদেশের খরচ ২ দশমিক ১৫ গুণ বেশি। চীনে একই ধরনের সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে অর্ধেক খরচে। তুরস্কে এক কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণে যে খরচ হয়, বাংলাদেশে হয়েছে এর প্রায় চার গুণ।

বর্তমান বিএনপি সরকার বড় প্রকল্পে ব্যয় কমানোর বিষয়ে জোর দিয়েছে। এর মধ্যে সাসেক-২ প্রকল্পে বাড়তি ব্যয়ের বিষয়টি সামনে এসেছে। সাসেক প্রকল্পটি ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে অনুমোদন দেয় সরকার। ২০২১ সালের আগস্টের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। ২০১৯ সালে প্রকল্প ব্যয় বাড়িয়ে হয় ১৬ হাজার ৬৬২ কোটি টাকা। ২০২৪ সালে ব্যয় বাড়িয়ে করা হয় ১৮ হাজার ৬৭৯ কোটি টাকা। সর্বশেষ অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রকল্পের মেয়াদ দুই বছর বাড়ানো হয় এবং ব্যয় দাঁড়ায় ১৯ হাজার ৫৬ কোটি টাকা। চলতি বছরের ডিসেম্বরে কাজ শেষ করার সময়সীমা নির্ধারিত আছে। গত মার্চ পর্যন্ত প্রকল্পের কাজের মোট অগ্রগতি ৮৯ শতাংশ।

সওজ সূত্র জানায়, বিগত অন্তর্বর্তী সরকার পুরো প্রকল্পের ব্যয় ও সময়সীমা বাড়িয়েছে। এখন প্রতিটি প্যাকেজে ঠিকাদারের চাওয়া মেনে বাড়তি কাজ ও ব্যয়ের (ভেরিয়েশন) অনুমোদনের তোড়জোড় চলছে। গত ৭ এপ্রিল এ-সংক্রান্ত প্রস্তাব সড়ক মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এরপর তা সরকারের ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি চূড়ান্ত অনুমোদন দেবে।

সওজ সূত্র জানায়, সড়ক ও সেতু নির্মাণসংক্রান্ত প্যাকেজগুলোর বেশির ভাগের ঠিকাদার চীনা কোম্পানি। বাংলাদেশি কোম্পানির মধ্যে আরও রয়েছে আব্দুল মোনেম, মীর আক্তার, মনিকো।

প্রকল্পের কাজ ১১টি ভাগে (প্যাকেজে) বাস্তবায়িত হচ্ছে। এর মধ্যে ৯টি প্যাকেজ সড়ক ও সেতু নির্মাণসংক্রান্ত। বাকি দুটি প্যাকেজের আওতায় ঢাকায় ভবন নির্মাণ, তিনটি ওজন নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র বসানো, সড়কের অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য গাড়ি ক্রয় রয়েছে। দুটি প্যাকেজেরই কাজ পেয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এনডিই।

সওজ সূত্র জানায়, সড়ক ও সেতু নির্মাণসংক্রান্ত প্যাকেজগুলোর বেশির ভাগের ঠিকাদার চীনা কোম্পানি। বাংলাদেশি কোম্পানির মধ্যে আরও রয়েছে আব্দুল মোনেম, মীর আক্তার, মনিকো।

এই প্রকল্পের জন্য জিপ, ডাবল কেবিন পিকআপ, মাইক্রোবাস, বাস ও মোটরসাইকেল মিলে দেড় শতাধিক যানবাহন কেনা হয়েছে। এর মধ্যে কিছু জিপসহ গাড়ি কেনার বিষয়টি অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদিত। বাকিগুলো প্রতিটি প্যাকেজের ভেতরে যুক্ত করে দেওয়া হয়েছে, যা ঠিকাদার ও প্রকল্প কর্তৃপক্ষ ছাড়া অন্যদের গোচরে আসে না।

এভাবে প্রকল্পটির সড়ক ও সেতু নির্মাণসংক্রান্ত নয়টি প্যাকেজের সবগুলোতেই একাধিকবার কাজ বেশি দেখিয়ে ব্যয় বাড়ানো হয়েছে। এর মধ্যে সর্বনিম্ন ১৭ থেকে সর্বোচ্চ ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত ভেরিয়েশন করা হয়েছে। সব কটিতেই একই কায়দায়, কম মূল্যের আইটেম বাদ দেওয়া হয়েছে। বেশি দামের আইটেম যোগ করা হয়েছে। এভাবে কারসাজি করে ভেরিয়েশন করা হয়েছে।

প্রকল্প পরিচালক ওয়ালিউর রহমান প্রথম আলোর কাছে দাবি করেন, প্রকল্পের নকশা করা হয়েছিল ২০১৪ সালে। এরপর নতুন নতুন চাহিদা যুক্ত হয়েছে। সে জন্য ব্যয় বেড়েছে। ঠিকাদারদের কারসাজি সম্পর্কে তিনি বলেন, অন্যান্য প্রকল্পের সঙ্গে তুলনা করলে এই প্রকল্পে ভেরিয়েশন কমই হয়েছে।

নতুন চার ভবন

মিরপুরের পাইকপাড়ায় চারটি বড় ভবন নির্মাণের কাজ চলছে। গবেষণাকেন্দ্র প্রথমে ৬ তলা করার কথা ছিল। পরে তা ১০ তলা করার সিদ্ধান্ত হয়। প্রশিক্ষণ ভবন ৬ তলা করার কথা ছিল। পরে ৭ তলা করা হচ্ছে। তবে ভিত্তি করা হচ্ছে ১০ তলার; যাতে ভবিষ্যতে বাড়ানো যায়।

ল্যাবরেটরি তিনতলা করার উদ্যোগ নিয়ে একতলা বাড়ানো হয়। ওয়েলফেয়ার ভবনটি দোতলা করার কথা ছিল। সেটির সঙ্গে বেজমেন্ট যুক্ত করা হয়। আরও যুক্ত হয় জিম, ইনডোর গেম এলাকা, বিলাসবহুল লাউঞ্জ। কর্মচারীদের থাকার জন্য চারটি চারতলা ভবনও নির্মাণ করা হচ্ছে। কর্মচারীদের চারটি ভবনের ব্যয় ধরা হয়েছে ১৩ কোটি। আর কর্মকর্তাদের অবকাশ যাপনের জন্য করা একটি ভবনের ব্যয় ৩৩ কোটি টাকা।

নতুন ভবন যে জায়গায় করা হচ্ছে, এর পাশেই পুরোনো সব স্থাপনা রয়েছে। অর্থাৎ গবেষণা, ল্যাব, প্রশিক্ষণ এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসন আগে থেকেই ছিল। তবে আকারে ছোট এবং সুযোগ কিছুটা কম। এ ছাড়া প্রায় সাড়ে ৫ কোটি টাকা খরচ করে গেট এবং ৩ কোটি টাকার জেনারেটর ও সাবস্টেশন করা হচ্ছে।

অভ‍্যন্তরীণ বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম কেনার জন্য ব্যয় করা হবে ২০ কোটি টাকার বেশি। অফিস ফার্নিচার, ল‍্যাবরেটরির যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামাদির ব‍্যয় ধরা হয়েছে ৪০ কোটি টাকার বেশি।

কারসাজি করে ব্যয় বৃদ্ধি

সওজ সূত্র জানায়, নির্মাণকাজের ঠিকাদার নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রতিটি পণ্যের আলাদা আলাদা দাম হিসাব করা হয়। এর মধ্যে যারা কম মূল্য প্রস্তাব করে, তারাই কাজ পায়। মিরপুরের সড়ক গবেষণাগারে ভবন নির্মাণের দরপত্রে মোট উপকরণ (আইটেম) ছিল প্রায় তিন হাজার। ঠিকাদার কাজ পাওয়ার পর যেসব আইটেমের মূল্য সরকারের প্রাক্কলিত ব্যয়ের চেয়ে কম প্রস্তাব করা হয়েছিল, এর মধ্য থেকে ৫৫০ আইটেম বাদ দেওয়া হয়েছে। ফলে যে পরিমাণ মূল্যছাড়ে ঠিকাদার কাজ নিয়েছিলেন, সেটা আর কম থাকেনি। এরপর প্রায় ৪০০ আইটেমের পরিমাণ কমানো হয়েছে। এটাও ঠিকাদারের পক্ষে গেছে। এরপর ৬৫০টি নতুন উপকরণ যুক্ত করা হয়েছে, যেগুলোর মূল্য অনেক বেশি। এই কারসাজির ফলে ঠিকাদার প্রথম কাজটি যে দামে পেয়েছিলেন, এর চেয়ে ব্যয় বেড়ে গেছে ১০৩ কোটি টাকা। ফলে মূল চুক্তির সঙ্গে তুলনা করলে ভেরিয়েশন বা কাজ বৃদ্ধির হার দাঁড়ায় প্রায় ৮৫ শতাংশ।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ভবনের লিফট, এসি ও এ-সংক্রান্ত যন্ত্রপাতির পেছনেই ব্যয় করা হচ্ছে ২৫ কোটি টাকা। অভ‍্যন্তরীণ বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম কেনার জন্য ব্যয় করা হবে ২০ কোটি টাকার বেশি। অফিস ফার্নিচার, ল‍্যাবরেটরির যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামাদির ব‍্যয় ধরা হয়েছে ৪০ কোটি টাকার বেশি। অথচ প্রায় ৫০ কোটি টাকা মূল্যের আধুনিক ল‍্যাব সরঞ্জাম মিরপুরের গবেষণাগার এবং নারায়ণগঞ্জের মেঘনা ব্রিজসংলগ্ন সওজের গবেষণাকেন্দ্রে পড়ে আছে। দক্ষ জনবল ও ব্যবহার না থাকায় এগুলো বিকল হচ্ছে।

সরকারের ক্রয় আইন অনুসারে, মাটির অস্বাভাবিক আচরণ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছাড়া অবকাঠামো নির্মাণে এত আইটেম পরিবর্তন গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু ঠিকাদার নিয়োগের পর এই প্রকল্পে ৬ তলা ভবন ১০ তলায় উন্নীত করার মতো ভেরিয়েশন করা হয়েছে।

প্রকল্প পরিচালক ওয়ালিউর রহমানের দাবি, ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে গবেষণাগারের স্থাপনা করা হচ্ছে। বিশ্বমানের একটা প্রশিক্ষণকেন্দ্রের জন্য কিছু আধুনিক সুযোগ-সুবিধা দরকার।

সড়ক বিভাগের সচিব মোহাম্মদ জিয়াউল হক এ বিষয়ে প্রথম আলোকে বলেন, এই প্রকল্পের ব্যয় নিয়ে কিছু প্রশ্ন তাঁদের সামনে এসেছে। সেগুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে। অন্য অনেক প্রকল্পে বিলাসী ব্যয় কাটছাঁট করা হয়েছে। এখানেও সুযোগ থাকলে সেটা করা হবে। তিনি বলেন, প্রকল্প নেওয়ার সময়ই বিষয়গুলো বিবেচনায় নিলে ভালো হতো। এখন অনেক কাজ অর্ধেক বা বেশির ভাগ হয়ে গেছে। এ অবস্থায় বাদ দেওয়া কিছুটা জটিল।

গাছ কাটা ও পুকুর ভরাট

বিএনপি সরকার নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী আগামী পাঁচ বছরে সারা দেশে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর মধ্যে চলতি বছরেই ৫ কোটি গাছ লাগানোর লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ করছে সরকার। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খানের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের সেলও গঠন করা হয়েছে। অথচ সরকারেরই দপ্তর সওজ গাছ কেটে ভবন তৈরির প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সড়ক গবেষণাগার এলাকায় কয়েক হাজার গাছ আছে। এর মধ্যে এক হাজারের মতো সেগুন, মেহগনি, আকাশি ও কিছু ফলদ গাছ কেটে সেখানে ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে।

এ ছাড়া গবেষণাগার এলাকায় তিনটি পুকুর ছিল। এর মধ্যে একটি বড় পুকুর ভরাট করা হয়েছে। এমনকি পুকুর ভরাট ও জলাশয়ের পানিনিষ্কাশনের জন্য ঠিকাদার সরকারের কাছ থেকে টাকাও নিয়েছেন।

রাজউকের অনুমোদন নেই

সওজ সূত্র জানায়, এই প্রকল্পের অধীন ভবন নির্মাণের জন্য রাজউকের কোনো অনুমোদন নেওয়া হয়নি। এমনকি পরিবেশগত কোনো ছাড়পত্রও নেই। অবকাঠামোগত প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে পরিবেশগত ছাড়পত্র নেওয়া বাধ্যতামূলক।

পরিকল্পনাবিদদের সংগঠন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) ল্যান্ডসেট স্যাটেলাইট বিশ্লেষণ করে ২০২৩ সালে এক গবেষণায় উল্লেখ করে, ঢাকায় সবুজ এলাকা আছে মাত্র ৭ দশমিক ৯ শতাংশ। গত ২৮ বছরে ঢাকা থেকে অন্তত ৪৩ শতাংশ সবুজ এলাকা ধ্বংস হয়েছে। একই সময়ে ঢাকা থেকে ৮৫ দশমিক ৮৫ ভাগ জলাভূমি হারিয়ে গেছে। এ সময়ে নির্মাণ এলাকা বা স্থাপনা বেড়েছে ৭৫ ভাগ।

এ ছাড়া গবেষণাগার এলাকায় কর্মচারীদের থাকার জন্য নানা আকারের নয়টি ভবন ছিল। সেগুলো ভেঙে ফেলা হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি ভবন স্থপতি মাজহারুল ইসলামের নকশা করা। স্থপতি ইনস্টিটিউট থেকে ২০২০ সালে তৎকালীন সড়কমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরকে চিঠি দিয়ে এসব ভবন রেখে দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছিল। কারণ, মাজহারুল ইসলামের কিছু স্থাপত্য কর্ম ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্য স্থাপনার অন্তর্ভুক্ত করার জন্য আবেদন করা করেছিল স্থপতি ইনস্টিটিউট। সওজ কর্তৃপক্ষ এসব ভবন না ভাঙার আশ্বাস দিলেও তা পরে মানেনি।

গত শুক্রবার সরেজমিনে দেখা যায়, ঠিকাদারের লোকজন বেড়া দিয়ে কাজ করছেন। এর মধ্যে একটি ভবনের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। অন্য দুটি বড় ভবনের কাজ চলমান। কর্মচারীদের থাকার জন্য তিনটি ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। তবে এগুলো মানসম্মত নয় বলে একজন কর্মচারী অভিযোগ করেছেন।

৪০ থেকে ৫০ শতাংশ ভেরিয়েশন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বিগত সরকার বিলাসী ভবন ও প্রকল্প করে অর্থনীতিকে চাপে ফেলেছে। বর্তমান সরকারও যদি এভাবে ঋণ করা টাকায় বিলাসী ব্যয় অব্যাহত রাখে, তাহলে দেশের মানুষকে বিরাট মূল্য দিতে হবে।

বুয়েট পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও বড় প্রকল্প বিশেষজ্ঞ সামছুল হক

সওজের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, যে পরিমাণ কাজ হয়েছে, ঠিকাদার এর চেয়ে বেশি বিল নিয়ে গেছেন। যথাযথ তদন্ত হলে আরও অনেক অনিয়ম বেরিয়ে আসবে। এ ছাড়া সওজের পুরোনো ভবন ঠিকাদারের লোক ব্যবহার করছেন। যদিও আবাসন বাবদ তাঁরা খরচ নিচ্ছেন প্রকল্প থেকে।

পাইকপাড়ায় সওজের কেন্দ্রীয় গবেষণাগারটি প্রায় ৪১ একর জায়গাজুড়ে ১৯৬৫ সালে গড়ে তোলা হয়। কেন্দ্রীয় গবেষণাগার ছাড়াও মাঠপর্যায়ে আরও নয়টি গবেষণাগার আছে। কিন্তু ৫৮ বছরের পুরোনো এই প্রতিষ্ঠান সওজের সড়কের মান নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে পারছে না। অথচ উদ্দেশ্য ছিল দেশের সব সড়কের মান নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখবে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও বড় প্রকল্প বিশেষজ্ঞ সামছুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ ভেরিয়েশন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বিগত সরকার বিলাসী ভবন ও প্রকল্প করে অর্থনীতিকে চাপে ফেলেছে। বর্তমান সরকারও যদি এভাবে ঋণ করা টাকায় বিলাসী ব্যয় অব্যাহত রাখে, তাহলে দেশের মানুষকে বিরাট মূল্য দিতে হবে। এসব বিলাসী ব্যয় ও ঠিকাদারদের পক্ষে আইটেম পরিবর্তনের বিষয়টি স্বাধীন একটি কমিটি দিয়ে তদন্ত করা উচিত। নতুবা দেশের মানুষকে যুগের পর যুগ ঋণের বোঝা টেনে দেউলিয়া হতে হবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ