গাছ লাগিয়ে সবুজায়ন করা হবে, এমন প্রতিশ্রুতিতে সরকারি একটি সংস্থার জায়গা ব্যবহারের অনুমতি নিয়েছিলেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) সাবেক প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ। কিন্তু সেখানে গাছ লাগানো হয়নি। ‘সবুজ অঞ্চল তৈরির’ নামে কৌশলে একটি প্রতিষ্ঠানকে ফুডকোর্ট বা খাবারের দোকান বসানোর অনুমতি দিয়েছিলেন তিনি।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের ১ নম্বর সেক্টর এলাকায় ঘটনাটি ঘটেছে। পূর্বাচলের নীলা মার্কেটের কাছে টঙ্গী খালের (লেক) দুই পাশে গাছ লাগাতে সিটি করপোরেশনকে ওই জায়গা ব্যবহারের অনুমতি দেয় রাজউক কর্তৃপক্ষ। কিন্তু নিজেরা গাছ না লাগিয়ে সেখানে ভিভিড কনস্ট্রাকশন নামের ব্যক্তিমালিকানাধীন একটি প্রতিষ্ঠানকে সবুজায়নের পাশাপাশি ফুডকোর্ট করার অনুমোদন দেওয়া হয়।
ঢাকা উত্তর সিটির সম্পত্তি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, সাবেক প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজের ইচ্ছাতেই ওই জায়গায় ভিভিড কনস্ট্রাকশনকে কাজ দেওয়া হয়েছিল। ফুডকোর্টের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল রক্ষণাবেক্ষণের খরচ তুলতে।
তবে রাজউকের ওই প্রকল্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা বলছেন, গাছ লাগানোর জন্য জায়গা ব্যবহারের অনুমতি নিয়ে দোকান বরাদ্দ দেওয়ার সুযোগ নেই। করপোরেশন থেকে অনুমতি পাওয়া প্রতিষ্ঠান সেখানে দোকান বসাতে গেলে সে জন্য তাঁরা বাধাও দেন।
১৫টি ফুডকোর্টের অনুমোদন
ডিএনসিসির সম্পত্তি বিভাগের নথি অনুযায়ী, গত বছরের ৩ নভেম্বর ভিভিড কনস্ট্রাকশনের প্রধান নির্বাহী পরিচালক জেভিয়ার এস বিশ্বাসকে ফুডকোর্ট স্থাপনের অনুমতি দেয় সিটি করপোরেশন। বলা হয়, নীলা মার্কেটের কাছে টঙ্গী খালের দুই পাশের গ্রিন বেল্টের জন্য সংরক্ষিত স্থানে সবুজ অঞ্চল তৈরির বিনিময়ে প্রতিষ্ঠানটি ১৫টি ফুডকোর্ট বসাবে। ভিভিড কনস্ট্রাকশনের আবেদনে দুই বছরের জন্য এই অনুমতি দেওয়া হয়।
পূর্বাচলের জায়গাটি রাজউকের, তাতে সবুজায়নের কাজটি নিয়েছিল ডিএনসিসি, তারা আবার কাজটি দেয় ভিভিড কনস্ট্রাকশন নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে। তাদের আবার ১৫টি ফুডকোর্ট বসানোর অনুমতিও দেন মোহাম্মদ এজাজ। তখন তিনি ছিলেন ডিএনসিসির প্রশাসক।
পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পটি এখনো ঢাকা উত্তর সিটির আওতাভুক্ত হয়নি। নীলা মার্কেট এলাকাটি নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার আওতাধীন। তাহলে ভিভিড কর্তৃপক্ষ ঢাকা উত্তর সিটিতে আবেদন করল কেন?
এ প্রশ্নে জেভিয়ার এস বিশ্বাস প্রথম আলোকে বলেন, ঢাকায় সিটি করপোরেশনের ভেতরেই জায়গা খুঁজছিলেন। তখন তাঁদের পূর্বাচলের ওই জায়গার জন্য আবেদন করতে বলা হয়। গত বছরের ২৭ জুলাই তাঁরা আবেদন করেন।
অন্তর্বর্তী সরকার আমলে গত বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি মোহাম্মদ এজাজকে এক বছরের জন্য ডিএনসিসির প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগের দিন গত ১১ ফেব্রুয়ারি সেই মেয়াদ শেষের পর ডিএনসিসিতে তাঁর দায়িত্বের অবসান ঘটে।
রাজউক ও স্থানীয় সরকারের সমন্বয়ে সবুজায়নের অংশ হিসেবে ফুডকোর্ট বসানোর একটি পরীক্ষামূলক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। অনুমোদনটি দেওয়া হয়েছিল অস্থায়ী ব্যবস্থাপনার চিন্তা থেকে।
গত বুধবার দুপুরে গিয়ে দেখা যায়, বরাদ্দ দেওয়া জায়গাটি নীলা মার্কেট থেকে পূর্ব দিকে প্রায় ২৫০ মিটার দূরে টঙ্গী খালের ওপর নির্মিত ইছাপুরা সেতুর পাশে। সেতুর উত্তরে পূর্বাচল এক্সপ্রেসওয়ে (৩০০ ফুট সড়ক) ও দক্ষিণে ইছাপুরা বাজার। সেতুর উত্তর–দক্ষিণে খালের দুই পাড়ের প্রায় ৩০০ মিটার জায়গা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
ভিভিড কর্তৃপক্ষ সেখানে খুঁটি বসিয়ে সৌরবিদ্যুৎ–চালিত ১৪টি সড়কবাতি স্থাপন করেছে। খুঁটিতে বিজ্ঞাপন দেওয়ার ছোট লাইট বক্স রয়েছে। তাতে লেখা ‘ইওর অ্যাড হেয়ার’। নিচে যোগাযোগের মুঠোফোন নম্বর। খালপাড়ে রাজউকের নির্মিত হাঁটার রাস্তা ও সাইকেল লেন রয়েছে।
পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের কর্মকর্তারা বলছেন, শুধু গাছ লাগানোর জন্য ডিএনসিসিকে ওই জায়গা ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। গাছ লাগানোর কথা বলে সেখানে স্থায়ী, অস্থায়ী কিংবা ভ্রাম্যমাণ—কোনো প্রকার দোকান, স্থাপনা বরাদ্দের এখতিয়ার সিটি করপোরেশনের নেই। তাই বরাদ্দ পাওয়া ওই প্রতিষ্ঠানকে বাধা দেওয়া হয়েছে।
সিটি করপোরেশনকে কেবল গাছ লাগানো বা সবুজায়নের উদ্দেশ্যে ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। এটি ছিল সীমিত ও শর্তসাপেক্ষ অনুমতি। স্থায়ী বা বাণিজ্যিক কোনো কার্যক্রমের জন্য নয়।
রাজউকের কর্মকর্তারা বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, রাজউকের জায়গায় অন্য কোনো সংস্থা কীভাবে দোকান বরাদ্দ দিতে পারে? আর এভাবে বরাদ্দ দেওয়া নিয়ে ডিএনসিসি এখন কিছু বলছে না। তবে বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী ওই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হয়ে দোকান বসাতে দেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছে।
পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের অতিরিক্ত প্রকল্প পরিচালক খন্দকার মো. ওয়াহিদ সাদিক প্রথম আলোকে বলেন, সিটি করপোরেশনকে কেবল গাছ লাগানো বা সবুজায়নের উদ্দেশ্যে ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। এটি ছিল সীমিত ও শর্তসাপেক্ষ অনুমতি। স্থায়ী বা বাণিজ্যিক কোনো কার্যক্রমের জন্য নয়। কিছু ব্যক্তি সেখানে দোকান বসানোর চেষ্টা করলে তাঁদের বাধা দেওয়া হয়।
এভাবে ফুডকোর্টের অনুমতি দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা উত্তর সিটির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা মোহাম্মদ শওকত ওসমান প্রথম আলোকে বলেন, সবুজায়ন ও রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় রয়েছে, সেই বাস্তবতা থেকেই অস্থায়ীভাবে কিছু ভ্রাম্যমাণ খাবার বিক্রির সীমিত কার্যক্রম চালুর চিন্তা করা হয়। প্রশাসকের ইচ্ছাতেই ওই অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময় আপত্তি ও বিতর্ক তৈরি হওয়ায় উদ্যোগটি বাতিলও করা হয়।
সাবেক প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ প্রথম আলোকে বলেন, রাজউক ও স্থানীয় সরকারের সমন্বয়ে সবুজায়নের অংশ হিসেবে ফুডকোর্ট বসানোর একটি পরীক্ষামূলক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। অনুমোদনটি দেওয়া হয়েছিল অস্থায়ী ব্যবস্থাপনার চিন্তা থেকে।
অনুমোদন দেওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যেই ওই উদ্যোগ ঘিরে বিভিন্ন অনিয়ম ও তা অন্যদের কাছে বিক্রির চেষ্টার অভিযোগ এলে বাতিল করে দেওয়া হয়, বলেন মোহাম্মদ এজাজ।
মোহাম্মদ এজাজ ও শওকত ওসমানের দাবি ফুডকোর্টের অনুমোদন বাতিল করা হয়েছে। তবে নথি ঘেঁটে দেখা যায়, অনুমোদন এখনো বাতিল হয়নি।
গত বছরের ৪ ডিসেম্বর ভিভিডের নির্বাহী পরিচালক জেভিয়ার এস বিশ্বাসকে দেওয়া এক চিঠিতে বলা হয়, ১৫টি ফুডকোর্ট পরিচালনার কার্যক্রম ‘সাময়িকভাবে স্থগিত’ করা হলো। তবে লেকের পাশের সৌন্দর্যবর্ধন, মাটি সংরক্ষণ, পরিবেশগত মানোন্নয়ন, জীববৈচিত্র্য রক্ষা ও জনসাধারণের জন্য সবুজ অঞ্চল তৈরির কার্যক্রম চলবে।
ডিএনসিসির সম্পত্তি বিভাগের একটি সূত্র জানিয়েছে, সাবেক প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঘুষ গ্রহণের অনেক অভিযোগ ছিল। এসব বিষয়ে গত বছরের ২৭ নভেম্বর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অনুসন্ধান শুরু করে। মূলত এরপরেই তিনি তাঁর আমলে দেওয়া অবৈধ বরাদ্দ ও অনুমোদনগুলোর কিছু বাতিল করে দেন, কিছু আবার স্থগিত করেন। স্থগিত করে রাখাটা বরাদ্দ দেওয়া প্রতিষ্ঠানকে ‘অপেক্ষায়’ রাখার একটি কৌশল মাত্র।
এদিকে এই পরিস্থিতিতে আর্থিক ক্ষতিতে পড়ার কথা জানিয়েছেন ভিভিডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জেভিয়ার এস বিশ্বাস। তিনি বলেন, জায়গাটি পরিষ্কার করে সেখানে প্রায় ১ হাজার ৩০০টি গাছ লাগানো হয়েছে। সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করা হয়েছে। এসব কাজে ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগ হয়েছে। পাশাপাশি নিরাপত্তা জামানত নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।








