
পাম্প মালিকদের খামখেয়ালিপনায় দুর্ভোগের নগরী ঢাকা
শাপলানিউজ.কম
রাজধানীজুড়ে এখন এক অদ্ভুত ও অসহনীয় দৃশ্য। রাজপথের স্বাভাবিক গতি থমকে গেছে তেলের পাম্পগুলোকে কেন্দ্র করে। শহরের যেখানেই একটি পেট্রোল পাম্প, সেখানেই তৈরি হয়েছে যানজটের নতুন এক ‘এপিসেন্টার’। তেলের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা যানবাহনের দীর্ঘ সারি মূল সড়ককে এতটাই সংকুচিত করেছে যে, সাধারণ চলাচল কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। জ্বালানি তেলের সংকটের সাথে পাম্প মালিকদের অব্যবস্থাপনা ও খামখেয়ালিপনা যোগ হয়ে রাজধানীবাসীর জনদুর্ভোগ এখন চরমে পৌঁছেছে।
ঢাকার বিভিন্ন পাম্পের সামনের প্রাইভেটকারের লাইন কোথাও কোথাও কিলোমিটার ছাড়িয়েছে। ফলে পাশের লেন কার্যত বন্ধ হয়ে পড়ছে। গণপরিবহণ আটকে যাচ্ছে। যাত্রীরা নেমে হেঁটে গন্তব্যে যাচ্ছেন। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে, ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত পাম্পগুলোর সামনে একই চিত্র—দীর্ঘ লাইন, ক্লান্ত অপেক্ষা আর অনিশ্চয়তা।
অভিযোগ উঠেছে, অনেক পাম্পে পর্যাপ্ত জ্বালানি থাকা সত্ত্বেও ‘টেকনিক্যাল সমস্যা’ বা ‘সরবরাহ কম’—এমন অজুহাতে মাত্র একটি বা দুটি নজেল সচল রাখা হয়েছে। এর ফলে একটি গাড়ি তেল নিতে স্বাভাবিকের চেয়ে তিন থেকে চার গুণ বেশি সময় ব্যয় করছে। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন নগরবাসী। অব্যবস্থাপনা বন্ধে অতিদ্রুত দায়ী পাম্প মালিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী পথচারীরা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বিজয় সরণির ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকারের সারি মহাখালী রেলগেট পর্যন্ত গিয়ে ঠেকেছে। কেউ দুই ঘণ্টা, আবার কেউ পাঁচ ঘণ্টা ধরে অপেক্ষা করছেন। শাপলা চত্বর থেকে ইত্তেফাক মোড় এবং দৈনিক বাংলা মোড় পর্যন্ত তেলের লাইনের কারণে যানজট এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, মানুষ গাড়ি থেকে নেমে হাঁটতে বাধ্য হচ্ছেন। সবচেয়ে দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে উত্তরা ও আব্দুল্লাহপুরে। হাউজ বিল্ডিং থেকে আব্দুল্লাহপুর পর্যন্ত পাম্পগুলোর সামনে বাসের দীর্ঘ সারির কারণে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে যানবাহন চলাচল স্থবির হয়ে আছে।
রাজধানীর মেরুল বাড্ডা, উত্তর বাড্ডা, শাহজাদপুর, নতুন বাজার, কুড়িল, মগবাজার, রাজারবাগ ও নীলক্ষেত, মিরপুর, শেওড়াপাড়া, গাবতলী, আসাদগেট, তেজগাঁও, কুড়িল, যাত্রাবাড়ী সবখানেই পাম্পঘেঁষা সড়কগুলো পরিণত হয়েছে অচল করিডরে। এসব এলাকা ঘুরে দেখা গেছে বিভীষিকাময় চিত্র। প্রতিটি পাম্প কেন্দ্র করে সৃষ্টি হয়েছে দীর্ঘ যানজট, যা মূল সড়কের স্বাভাবিক যান চলাচলকে প্রায় অচল করে দিয়েছে। ট্রাফিক পুলিশের কর্মকর্তারা বলছেন, এই যানজট কোনো স্বাভাবিক চাপ নয়। এটি ‘স্ট্যাটিক কনজেশন’ অর্থাৎ, চলমান গাড়ির চাপ নয়, বরং স্থির লাইনের কারণেই সড়ক দখল হয়ে যাচ্ছে।
গণপরিবহন চালকদের দাবি, পাম্প মালিকরা ইচ্ছাকৃতভাবে ধীরগতিতে তেল দিচ্ছে যাতে মানুষের মনে সংকটের আতঙ্ক তৈরি হয়। অনেক পাম্প চত্বরে পর্যাপ্ত জায়গা থাকা সত্ত্বেও গাড়িগুলোকে রাস্তায় দাঁড় করিয়ে রাখা হচ্ছে, যা ট্রাফিক ব্যবস্থাকে পুরোপুরি ভেঙে দিচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে জ্বালানি সংকটের আশঙ্কায় অনেক চালক প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল মজুদ করার চেষ্টা করছেন। অনেকে বোতলে বা ড্রামে করে তেল কিনছেন, যা পাম্পের ভিড়কে আরও দীর্ঘস্থায়ী করছে। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে জ্বালানির পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে, তবে মাঠপর্যায়ে সরবরাহ ও চাহিদার ভারসাম্যহীনতা কাটছে না।
এদিকে, রাজধানীতে অফিস ছুটির সময়ে এই ভোগান্তি চরমে পৌঁছায়। তেজগাঁও, কল্যাণপুর, মগবাজার এবং প্রগতি সরণির মতো এলাকাগুলোতে অফিসগামী যাত্রী ও সাধারণ মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় আটকে থাকছেন।
পাম্প মালিকদের এই খামখেয়ালিপনার বিষয়ে যেন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেয় সেই দাবি জানিয়েছেন দুর্ভোগের শিকার নগরবাসী। যদিও সড়কের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পাম্পের ভেতর দ্রুত রিফুয়েলিং নিশ্চিত করার কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে অধিকাংশ পাম্পেই তা মানা হচ্ছে না।
এদিকে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার বর্তমানে মজুদদারদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত না হয়ে স্বাভাবিকভাবে তেল সংগ্রহ করার আহ্বান জানানো হয়েছে। তবে পাম্পগুলোতে শৃঙ্খলা না ফিরলে এবং মালিকপক্ষ দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন না করলে রাজধানীর এই স্থবিরতা সহসা কাটছে না বলে মনে করছেন নগরবাসী।