মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের চতুর্থ সপ্তাহে এসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একদিকে সামরিক অভিযান ‘গুটিয়ে নেওয়ার’ সম্ভাবনার কথা বলছেন, অন্যদিকে যুদ্ধবিরতির বিষয়ে কঠোর অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন। ফলে তার বক্তব্যে আবারও দ্বিমুখী সংকেত স্পষ্ট হয়েছে।
হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক তৎপরতা সীমিত করার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। পরে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে তিনি লেখেন, যুক্তরাষ্ট্র তাদের লক্ষ্য পূরণের খুব কাছাকাছি পৌঁছেছে এবং “মহান সামরিক প্রচেষ্টা গুটিয়ে নেওয়ার” বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে ভাবা হচ্ছে।
তবে একইসঙ্গে তিনি স্পষ্ট করে দেন, ইরানের সঙ্গে কোনো ধরনের যুদ্ধবিরতিতে তার আগ্রহ নেই। ট্রাম্পের ভাষায়, “যখন প্রতিপক্ষকে প্রায় নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হচ্ছে, তখন যুদ্ধবিরতি চাওয়ার কোনো মানে হয় না।” তার এই বক্তব্য যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
যুদ্ধক্ষেত্রে উত্তেজনা অব্যাহত
ট্রাম্পের এমন মন্তব্যের মধ্যেই ইরান ও ইসরায়েল-এর মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা থামেনি। ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী দাবি করেছে, তারা ইসরায়েলের বেনগুরিয়েন বিমানবন্দর লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালিয়েছে, যেখানে জ্বালানি ট্যাংকার ও রিফুয়েলিং উড়োজাহাজকে নিশানা করা হয়।
এছাড়া মধ্য ইসরায়েলের বিভিন্ন স্থানে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার খবর পাওয়া গেছে। একই সময়ে ইরানের আকাশসীমায় ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান বিমানবিধ্বংসী হামলার মুখে পড়েছে বলে তেল আবিব স্বীকার করেছে।
ইরান শুধু ইসরায়েলেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সামরিক অবস্থান, এমনকি ভারত মহাসাগরের দূরবর্তী ঘাঁটিতেও হামলার চেষ্টা চালিয়েছে। এতে যুদ্ধের ভৌগোলিক পরিসর উল্লেখযোগ্যভাবে বিস্তৃত হয়েছে।
হরমুজ প্রণালি ও জ্বালানি সংকট
সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট হরমুজ প্রণালি। এই পথ দিয়ে বৈশ্বিক তেলের একটি বড় অংশ পরিবাহিত হয়। ইরান এই প্রণালিতে চাপ সৃষ্টি করায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায়—এক পর্যায়ে প্রতি ব্যারেল ১১৫-১২০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছে।
এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্প প্রশাসন বাধ্য হয়ে ইরানি তেলের ওপর কিছু নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করেছে। এর ফলে ভারতসহ এশিয়ার কয়েকটি দেশ আবারও ইরানি তেল কেনার আগ্রহ দেখাচ্ছে।
সামরিক প্রস্তুতি বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র
যদিও ট্রাম্প ‘গুটিয়ে নেওয়ার’ কথা বলছেন, বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি বাড়াচ্ছে। নতুন করে তিনটি উভচর যুদ্ধজাহাজ এবং প্রায় আড়াই হাজার মেরিন সেনা পাঠানো হচ্ছে বলে জানা গেছে।
কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খারগ দ্বীপ দখল বা অবরোধ করার পরিকল্পনাও বিবেচনায় রয়েছে। এই দ্বীপ ইরানের তেল রপ্তানির প্রধান কেন্দ্র হওয়ায় এটি নিয়ন্ত্রণে নেওয়া গেলে তেহরানের ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব হবে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেই এ নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে। রিপাবলিকান পার্টির কিছু নেতাও সরাসরি স্থল অভিযান বা দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে জড়ানোর বিরুদ্ধে সতর্ক করেছেন।
ইসরায়েলের কঠোর অবস্থান
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ জানিয়েছেন, “যুদ্ধের সব লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত অভিযান চলবে।” তিনি আরও বলেন, ইরানের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করা, কমান্ডারদের নির্মূল করা এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত হামলা বন্ধ হবে না। এ অবস্থান ইঙ্গিত দেয় যে, ইসরায়েল সংঘাত দীর্ঘায়িত করতেও প্রস্তুত।
ইরানের বার্তা
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি স্পষ্ট করে বলেছেন, তারা কোনো অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি মেনে নেবে না। তার ভাষায়, “এই যুদ্ধ আমাদের নয়, আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাই স্থায়ী সমাধান ছাড়া আমরা থামব না।” এই অবস্থান সংঘাতের দ্রুত অবসানের সম্ভাবনাকে আরও জটিল করে তুলেছে।
রাশিয়ার অবস্থান
এদিকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন নওরোজ উপলক্ষে দেওয়া বার্তায় ইরানের পাশে থাকার ঘোষণা দিয়েছেন। মস্কোর মতে, এই যুদ্ধ পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটকে তীব্র করেছে। রাশিয়ার এই সমর্থন ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বাড়াতে পারে।
সব মিলিয়ে পরিস্থিতি একটি জটিল মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। ট্রাম্প একদিকে যুদ্ধ কমানোর ইঙ্গিত দিচ্ছেন, অন্যদিকে সামরিক প্রস্তুতি বাড়ছে। ইসরায়েল যুদ্ধ চালিয়ে যেতে দৃঢ়। ইরান স্থায়ী সমাধান ছাড়া থামতে রাজি নয়।
ফলে কূটনৈতিক ভাষায় নমনীয়তার আভাস থাকলেও বাস্তবে সংঘাত আরও বিস্তৃত ও দীর্ঘায়িত হওয়ার ঝুঁকিই বেশি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।







