উপকূলের জীবন
ভাঙন আর জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতবিক্ষত জনপদ ঢালচর
শিপু ফরাজী, চরফ্যাশন (ভোলা)
প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৫,
ভাঙন আর জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতবিক্ষত জনপদ ঢালচর
চারদিকে অথই পানির মাঝে ছোট্ট ভূখণ্ড। নাম ঢালচর। ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার মূল ভূখণ্ড থেকে নদী পথে ২৭ কিমি। মেঘনার তীব্র ভাঙনে যার রূপ প্রতি দিনই ওলটপালট হয়। চরফ্যাশনের এই বিচ্ছিন্ন দ্বীপ ইউনিয়ন আজ জলবায়ু পরিবর্তন, নদীভাঙন ও সাগরের দাপটে সবচেয়ে বিপর্যস্ত জনপদগুলোর একটি। প্রতিদিন সাগর থেকে ওঠা বিশাল ঢেউয়ে তলিয়ে যাচ্ছে মানুষের বসতি। গত এক দশকে ঢালচরের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মাটিই নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। শুধু গত কয়েক বছরে গৃহহীন হয়েছে অন্তত ৫০০০ পরিবার। নতুন আশ্রয়ের খোঁজে তারা ছুটছে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে। কিন্তু কোথাও স্থায়ী নিরাপত্তা নেই। ঢালচরের বর্তমান স্থায়ী বাসিন্দা প্রায় ১৫ হাজার।
ঢালচরের মানুষের জীবন নির্ভর করে মাছ ধরা ও ক্ষুদ্র কৃষিকাজের ওপর। জেলেরা সমুদ্র পাড়ি দিয়ে মাছ ধরতে যান। কৃষকরা চেষ্টা করেন জমিতে ধান, মিষ্টি আলু, শাকসবজি ফলাতে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এই দ্বীপের মানুষ এখন প্রতিনিয়ত বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, সাইক্লোন ও নদীভাঙনের সঙ্গে যুদ্ধ করছে। এবারের পুরো বর্ষা মৌসুমে ইউনিয়নের অর্ধেক অংশ বিলীন হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এতে আরও সহস্রাধিক পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়বে।
খাসজমিতে অধিকার চান জলবায়ু উদ্বাস্তু মানুষ : আশার জায়গা ছিল অনাবাদি খাসজমি। কিন্তু বন বিভাগের কড়াকড়ির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো বসতি গড়তে পারছে না। ফলে একদিকে ঘরবাড়ি ভাঙনের কবলে চলে যাচ্ছে, অন্যদিকে পুনর্বাসনের জায়গা থেকেও তারা বঞ্চিত। নদী ভাঙনে ছোট হয়ে এলেও এর পশ্চিম ও দক্ষিণে পড়ে আছে প্রায় দুই হাজার একর পতিত খাসজমি। বলতে গেলে ভাঙনের বিপরীতে বিপুল সম্ভাবনার হাতছানি। দ্বীপের মানুষ এই জমিতে অধিকার চান। গড়তে চান বসতি, আবার গড়ে তুলতে চান সাজানো গোছানো বাড়ি। কিন্তু আইনগত জটিলতা তাদের সে দাবি পূরণে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই এলাকায় প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো ছড়ানো ছিটানো কিছু গাছ রয়েছে।
বনের পাশে চরের সরু খাল। খালের ওপারে আবারও বৃহৎ বনাঞ্চল। কিন্তু এই বনের গা ঘেঁষে আরও রয়েছে বিশাল খাসজমি; যেখানে কোনো গাছপালা নেই। বন এলাকায় বসতবাড়ি নির্মাণের ক্ষেত্রে আইনগত জটিলতা দেখিয়ে বনের ধারে বিপুল পরিমাণ খাসজমি পড়ে থাকলেও তাতে ভূমিহীনের অধিকার প্রতিষ্ঠা হচ্ছে না। যাদের কিছু অর্থকড়ি আছে, তারা জমি কিনে অন্যত্র বাড়ি করতে পারলেও যাদের সেই সামর্থ্যটুকু নেই, তারা পড়ে আছেন এখানেই। পরিবেশের বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় ৮-১০ বার বাড়ি বদল করেও তাদের জীবনে আসেনি স্থিতিশীলতা। হাতে জমির কাগজপত্র পেয়েও অনেকের ঠাঁই মেলে না নতুন চরে। ঢালচর ভূমিহীন কৃষক সমবায় সমিতির সদস্য মাস্টার আনিসুর রহমান বলেন, ১৯৮৩ সালের জরিপ অনুযায়ী আমরা খাসজমিতে দখল চেয়েছি। আমরা বলছি, এই জমিতে বন উৎপাদনের কোনো উপযোগিতা নেই। এখানে ফসল আবাদ, বৃক্ষজাতীয় উদ্ভিদ এবং বসতি গড়ার যথেষ্ট উপযোগিতা রয়েছে। বন্দোবস্ত দেওয়া হলে দ্বীপের সব ভূমিহীন পরিবার মাথা গোঁজার ঠাঁই পাবে।
বন বিভাগের ঢালচর রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা মইনুল ইসলাম বলেন, নতুন চর জাগিয়ে তোলা বা শক্ত করার লক্ষ্য নিয়ে চরে বন বিভাগের তত্ত্বাবধানে গাছ লাগানো হয়। ঢালচরের বন এলাকার কিছু খাসজমির বয়স ৩০-৪০ বছর হয়েছে। কিছু এলাকায় গাছপালা নেই। তবে এ জমি ভূমিহীনের জন্য বরাদ্দের ক্ষেত্রে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকের প্রয়োজন রয়েছে। ওই বৈঠকের মধ্য দিয়ে খাসজমি বন বিভাগের কাছ থেকে স্থানীয় সরকার বিভাগ পাবে। সেখান থেকে জমি বন্দোবস্তের নিয়ম।
ম্যানগ্রোভ বন হারিয়ে যাওয়ার শঙ্কা : ঢালচরের ৯ হাজার ৪৭৬ হেক্টর ম্যানগ্রোভ বন দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ। এই বন শুধু জীববৈচিত্র্যের ভাণ্ডারই নয়, বরং উপকূলকে ভাঙন ও ঘূর্ণিঝড় থেকে সুরক্ষার প্রাকৃতিক প্রাচীর। কিন্তু গত কয়েক বছরে এই বনের বিশাল অংশ নদীগর্ভে হারিয়ে গেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, সাগর-মোহনার ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে স্থায়ী ভাঙন রোধ এখানে প্রায় অসম্ভব। বন বিভাগের হিসাব বলছে, শুধু এ বছরেই প্রায় ১২০০ হেক্টরের বেশি বনভূমি ভেঙে গেছে।
জীবিকা হুমকির মুখে : পঞ্চান্ন পেরোনো রফিক মাঝির হিসাব মেলে না। পঁয়তাল্লিশ বছর মাছ ধরেছেন সমুদ্রে; তবে অবস্থা বদলেনি। টানাটানির সংসার। সমুদ্র বিক্ষুব্ধ হয়েছে, মাছ কমেছে, ঝুঁকি বেড়েছে। দিনে দিনে নূরুদ্দিন মাঝি, তৈয়ব মাঝি, ইব্রাহিম মাঝি, কাঞ্চন মাঝিদের দেনার খাতা ভারি হতে থাকে। তবুও আশায় বুক বাঁধে-কবে আসবে সুদিন, দেনা শোধের আশা নিয়ে আবার নামবে সমুদ্রে। ভাঙনের তীব্রতায় আতঙ্কে দিনাতিপাত করছে ঢালচরের জেলে পল্লীর বাসিন্দারা। শত শত পরিবার প্রতিদিন অস্থায়ী আশ্রয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর হাওলাদার বলেন, সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো নদীভাঙন। আগে এভাবে প্রতি বছর ভাঙন দেখিনি। ঢালচরে রাস্তাঘাট নেই, ব্রিজ-কালভার্ট নেই, নেই পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্র। খাবার পানির সংকট তীব্র, আবাসন নেই, স্বাস্থ্যসেবা নেই। যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা আমাদের জীবনকে আরও কষ্টকর করে তুলেছে। কৃষকরা জানালেন, মাটিতে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় আর চাষাবাদ সম্ভব হচ্ছে না। শিশুদের অর্ধেকই বিদ্যালয়ে যায় না। একমাত্র মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বলেন, অভিভাবকের অজ্ঞতা, দারিদ্র্য ও নিয়মিত স্থানান্তরের কারণে শিশুরা পড়াশোনায় টিকতে পারে না।
এছাড়া স্বাস্থ্যসেবার অবস্থাও করুণ। চিকিৎসা বলতে ভরসা হাতুড়ে ডাক্তার বা কবিরাজ। জিন-পরী নামানো থেকে শুরু করে পক্ষাঘাত, শরীরে ভাঙা-মচকা এবং চর্ম রোগেরও চিকিৎসা করে থাকেন কবিরাজ। ইউনিয়নে একটি কমিউনিটি ক্লিনিক ছিল, সেটিও ভাঙনে নদীগর্ভে তলিয়ে গেছে। উপজেলা থেকে বিচ্ছিন্ন এই চরে পাকা সড়ক নেই। গত ২৯ মে নিম্নচাপের প্রভাবে প্রায় দুই কিলোমিটার ইটের রাস্তার বিভিন্ন অংশ ভেঙে গেছে। এলাকার প্রবীণ রফিক মাঝি বলেন, মেঘনা দিনে দিনে আমাদের সব কেড়ে নিচ্ছে। আমরা ক্লান্ত, তবুও বেঁচে থাকার জন্য লড়াই চালিয়ে যাচ্ছি। নদীর এই ভাঙন রোধে সরকারি কোনো উদ্যোগ না থাকায় নিজ উদ্যোগে প্রতিরোধের চেষ্টা করছেন চরবাসী। ভাঙন কবলিতরা স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ডে বারবার যোগাযোগ করেও কোনো প্রতিকার পাননি বলে জানান। পানি উন্নয়ন বোর্ড ডিভিশন-২ এর নির্বাহী প্রকৌশলী ফোনে বলেন, এই সময় বরাদ্দ কিংবা অনুমতি না থাকায় ভাঙন রোধে ব্যবস্থা নিতে পারছেন না তারা। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাসনা শারমিন মিথি বলেন, ঢালচরের নদী ভাঙন রোধ কল্পে আপাতত কোনো প্রকল্প নেই। ভাঙন কবলিত এলাকার মানুষ তাদের স্বেচ্ছাশ্রমে ভাঙন রোধে কাজ করছেন।
ভোলা