ডাকসু নির্বাচনে প্রচারণার দ্বিতীয় দিন
আচরণবিধি লঙ্ঘন নিয়ে পালটাপালটি অভিযোগ
Icon মাহাদী হাসান
প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৫,
আচরণবিধি লঙ্ঘন নিয়ে পালটাপালটি অভিযোগ
ছবি: সংগৃহীত
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন ঘিরে আনুষ্ঠানিক প্রচারণার দ্বিতীয় দিনে আচরণবিধি লংঘন নিয়ে প্রার্থীরা একে অন্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন। ভোটযুদ্ধে গোটা ক্যাম্পাস প্রাণবন্ত হয়ে উঠলেও আচরণবিধি মানার প্রতি প্রার্থীদের মধ্যে ছিল উদাসীনতা। এ নিয়ে পালটাপালটি অভিযোগ করেছেন প্রার্থীরা। নির্বাচনে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে প্রার্থীদের লাগানো ব্যানার ও ফেস্টুন সরিয়ে নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। বুধবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন এলাকা থেকে নির্বাচন কমিশন কর্তৃক গঠিত টাস্কফোর্সের নেতৃত্বে এসব ব্যানার-ফেস্টুন অপসারণ করা হয়। টিএসসি ও বিভিন্ন হলের ফটকে থাকা ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট’ ও ‘স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী ঐক্য’সহ বিভিন্ন প্যানেলের প্রচারণামূলক ব্যানার-ফেস্টুন প্রক্টরিয়াল টিমের গাড়িতে তুলতে দেখা গেছে। নির্বাচন পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ডাকসু নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে উত্তেজনা।
এদিকে বুধবার প্রার্থীদের পদচারণা ছিল চোখে পড়ার মতো। প্রতিটি প্যানেল বৈচিত্র্যময় থিমকে প্রাধান্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের কাছে টানার চেষ্টা চালাচ্ছে। ভোটারদের আকৃষ্ট করতে প্রচারণায় নিত্যনতুন কৌশল অবলম্বন করছে তারা। আবাসিক হলগুলোর পাশাপাশি অনাবাসিক ভোটারদের টানতে বিশেষভাবে কাজ করছে প্যানেলগুলো। মেয়েদের ভোট টানতে নারীবান্ধব ক্যাম্পাসের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন কোনো কোনো প্রার্থী। ছাত্রীদের আবাসন, স্বাস্থ্য, গর্ভকালীন ছুটি ও ক্লাস উপস্থিতির বিষয় শিথিল করাসহ বিভিন্ন সমস্যা ডাকসুর মাধ্যমে সমাধানের আশ্বাস দিচ্ছেন।
অন্যদিকে অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের ভোট টানতে তুরুপের তাস হিসাবে কাজ করবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘লাল বাস’। ডাকসুর মাধ্যমে বাসের শিডিউল ও অবস্থানসংক্রান্ত সমস্যার সমাধানে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোটারের মন জয় করার চেষ্টা চলছে। এছাড়া ভোটারদের একাডেমিক ও হল সমস্যার সমাধানেরও প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন প্রার্থীরা।
একে অন্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ : ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক (জিএস) প্রার্থী শেখ তানভীর বারী হামিম বলেন, ডাকসু নির্বাচনের আচারণবিধি লঙ্ঘনে ক্যাম্পাসে তোড়জোড় শুরু হয়েছে। পুরো ক্যাম্পাস ব্যানার ফেস্টুনে ভরে গেছে। আমরা চাইলেই কিন্তু ব্যানার-ফেস্টুন লাগাতে পারতাম। তবে আচরণবিধির প্রতি সম্মান জানিয়ে তা আমরা করিনি। আমরা চাই ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশে রাজনীতি চলুক। তিনি বলেন, আমরা দেখছি ইসলামী ছাত্রশিবিরসহ বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা বিলবোর্ড লাগিয়ে পুরো ক্যাম্পাসে এক ধরনের বিপর্যয় এনে ফেলেছে। নির্বাচন কমিশন মঙ্গলবার রাতে একটি প্রেস রিলিজ দিয়েছে। কিন্তু এখনো আমরা সেটি কার্যকর হতে দেখছি না। বরং দেখছি ব্যানার ফিস্টুনের যে আধিক্য বেড়ে চলেছে।
‘বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী সংসদ’ প্যানেলের জিএস পদপ্রার্থী আবু বাকের মজুমদার কমিশনের ভূমিকা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে বলেন, মনোনয়নপত্র জমাদানের শেষদিনে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল আচরণবিধি ভেঙেছে। তবুও প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এখন ক্যাম্পাসে ব্যানার-পোস্টারে ছেয়ে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয় বুধবার তিনটার মধ্যে সব সরানোর নির্দেশ দিলেও অনেকেই সরায়নি। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, এ নির্বাচন কমিশন আসলেই কি সুষ্ঠু নির্বাচন দিতে পারবে? যারা নিয়ম ভাঙছে, তাদের বিরুদ্ধে কমিশন কোনো পদক্ষেপ নিতে পারছে না বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
ইসলামী ছাত্রশিবিরের জিএস প্রার্থী এসএম ফরহাদ সাংবাদিকদের বলেন, চারুকলায় একটি কুচক্রী মহল আমাদের ব্যানারকে বিকৃত করা, ছবি বিকৃত করা এবং হিজাবোফোবিয়ার প্রকাশ করেছে। সেটির প্রতিবাদ আমরা জানিয়েছি। ইউনিভার্সিটি প্রশাসনকে লিখিত অভিযোগ দিয়েছি। এটা নির্বাচনের আচরণবিধি সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। তিনি বলেন, ছাত্রীদের হিজাব ও চেহারা বিকৃতির বহিঃপ্রকাশ যারা ঘটিয়েছে সেটির প্রতিবাদ ও লিখিত অভিযোগ দেওয়া সত্ত্বেও এখনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এতে করে ইউনিভার্সিটি প্রশাসনের লেভেল ফিল্ড নিয়ে আমরা সন্দিহান।
তিনি বলেন, আরেকটা বিষয় কনফিউশন তৈরি করেছে। মঙ্গলবার যে কাঠের ফ্রেমে আমাদের ব্যানার ও প্রচারণা মেটেরিয়াল ছিল, সেগুলো প্রক্টরিয়াল টিম উঠিয়ে নিয়েছে। সেটি কেন আমরা লাগিয়েছি কেন এই প্রশ্নগুলো আসছে। তাতে একটু ক্লারিফিকেশন দরকার আছে। আচরণবিধিতে কনসার্ন ছিল যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়ালে বা দেওয়ালে, স্থাপনায় বা গাছে বা অন্য কিছুর ক্ষতি হবে-এমন গ্লু দিয়ে লাগানো, প্যারেক দিয়ে লাগানো বা স্থাপনায় কোনো ক্ষতি হবে তা সাঁটানো নিষিদ্ধ। পরে আমরা নির্বাচন কমিশনকে আগের দিন ফোন দিয়ে বলেছিলাম, আমরা এরকম ফ্রেমে লাগিয়ে ব্যানার লাগাতে পারব কিনা? তখন তারা (বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন) আমাদের স্পষ্ট বলেছিল, হ্যাঁ তোমরা পারবে। এরপর আমরা ক্ষুদ্র সক্ষমতায় ক্যাম্পাসে বিভিন্ন স্পটে আমাদের প্যানেলের পরিচিতি করানোর জন্য সেগুলো দিয়েছি। দেওয়ার পরে সারাদিন কোনো খোঁজখবর নেই, যখন হঠাৎ রাত ১০-১১টার পর ফিডব্যাক আসছে, এটা ঠিক হয়নি।
‘বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী সংসদ’ প্যানেলের ভিপি আব্দুল কাদের বলেন, আমাদের মনে হয়েছে প্রার্থীদের মধ্যে আচারণবিধি লঙ্ঘনের প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। কার চেয়ে কে বেশি আচরণবিধি লঙ্ঘন করবে। আমরা দেখেছি নির্বাচন কমিশন আচারণবিধি করার মধ্যে সীমাবদ্ধ। কে আচরণবিধি লঙ্ঘন করল কে করল না-সেটা তাদের দেখার বিষয় নয়। আমরা দাবি জানালেও তারা তা আমলে নিচ্ছেন না। তবে আমরা দেখছি যারা আচরণবিধি লঙ্ঘন করছেন তাদের এক্সট্রা বেনিফিট দিচ্ছেন। মনোনয়নপত্র সংগ্রহের সময় শেষ হলে একদল ছাত্রী তা সংগ্রহ করতে গেছে। তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি কমিশন। বরং কারও সঙ্গে পরামর্শ না করে মনোনয়নপত্র সংগ্রহের সময় একদিন বাড়িয়ে দিয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য : প্রার্থীদের আচরণবিধিভঙ্গের বিষয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক ড. মো. জসীম উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, আচরণবিধিতে ফেস্টুন লাগানো নিয়ে কিছু ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল। অনেক প্রার্থী ফেস্টুন বানিয়ে টানিয়েছে। আমরা সবাইকে জানিয়েছি নিজেদের ফেস্টুন সরিয়ে নিতে। তারা না সরানোয় টাস্কফোর্স ও প্রক্টরিয়াল টিমের সহায়তায় তা অপসারণ করা হচ্ছে। আমরা কাউকে বিশেষ সুবিধা দিচ্ছি না। কেউ কোনো অপরাধ করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছি।