• ঢাকা, বাংলাদেশ শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬, ১০:৩৮ অপরাহ্ন
  • [কনভাটার]
নোটিশ
সারাদেশের জেলা ও উপজেলায় সংবাদকর্মী আবশ্যক। নিজেকে যোগ্য মনে করলে এখনই যোগাযোগ করুন Mob: 01778840333, Email: m.r.01778840333@gmail.com

সাম্প্রদায়িক সংঘাতের নতুন অধ্যায়, অস্থিতিশীলতার আশঙ্কা

Sagar crime reporter / ১৫২ জন দেখেছে
আপডেট : শনিবার, ১ নভেম্বর, ২০২৫

জাতীয়

সাম্প্রদায়িক সংঘাতের নতুন অধ্যায়, অস্থিতিশীলতার আশঙ্কা

প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২৫,

সাম্প্রদায়িক সংঘাতের নতুন অধ্যায়, অস্থিতিশীলতার আশঙ্কা

বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় একমাত্র রাষ্ট্র যেখানে বহু শতাব্দীর ইতিহাস ধরে ধর্মীয় ঐক্য, সহনশীলতা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সংস্কৃতি সামাজিক জীবনের ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ভূখণ্ডে মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টানসহ বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায় যুগে যুগে পাশাপাশি বাস করেছে— কখনো সহাবস্থান, কখনো বন্ধুত্বপূর্ণ নির্ভরতার মধ্য দিয়ে। স্বাধীনতার পরও এই ঐতিহ্যবাহী সম্প্রীতি বহু প্রতিকূলতার মাঝেও টিকে ছিল। কিন্তু গত কয়েক দশকে, বিশেষ করে ২০১০ সালের পরের ঘটনাবলি, পরবর্তী নিরাপত্তা আখ্যান ও সাম্প্রতিক ২০২৪-২৫ সালের ধারা দেখাচ্ছে যে, ঐতিহ্যগত এই সহাবস্থানের ভিত্তি বারবার আঘাত পেয়েছে। ধর্ম অবমাননা, উগ্রবাদ, বিদেশি প্রভাব ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত উসকানির মিশ্রণে বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামোয় গভীর ফাটল ধরেছে— এটি শুধু ধর্ম বা বিশ্বাসের অবস্থা নয়, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রসঙ্গও হয়ে দাঁড়িয়েছে।

২০১০ সালের পর থেকে বাংলাদেশের সমাজ-রাজনীতিতে এক যুগান্তকারী প্রহর হিসেবে ইতিহাসে স্থান পেয়েছে। ব্লগিং ও অনলাইন মুক্তচিন্তার প্রাথমিক উদ্দেশ্য বিকৃত হয়ে একদল লেখকের ইসলামবিরোধী লেখালেখিতে পরিণত হয়, যা অনলাইনে সীমাবদ্ধ না থেকে জনরোষে মাঠ পর্যায়ে সংঘাত সৃষ্টি করে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নীরবতা ও পরবর্তী প্রতিক্রিয়াশীল আচরণ পরিস্থিতি জটিল করে তোলে— মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নামে ব্লগারদের রক্ষায় প্রচেষ্টা ধর্মপ্রাণ জনগণের মধ্যে গভীর ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। এ থেকেই শাহবাগ ও পরে শাপলা চত্বর পরিণত হয় বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সামাজিক দ্বন্দ্বের কেন্দ্রে।

আরও পড়ুন
জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোটের কোনো সুযোগ নেই: মির্জা ফখরুল
জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোটের কোনো সুযোগ নেই: মির্জা ফখরুল
শাহবাগ আন্দোলন যদিও ন্যায়ের দাবিতে শুরু হয়েছিল, অচিরেই তা ধর্মনিরপেক্ষতার আড়ালে ইসলামবিরোধী স্লোগানে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে, যা ধর্মপ্রাণ জনগণকে উত্তেজিত করে। হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের শাপলা চত্বর সমাবেশে সরকারের রাতের অভিযানে বহু হতাহতের ঘটনা ঘটে— যার সরকারি ও অনানুষ্ঠানিক বিবরণে গভীর ফারাক থেকে রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যে অবিশ্বাস বাড়ে।

পরবর্তীতে অনন্ত বিজয় দাশ, অভিজিৎ রায়সহ একাধিক ব্লগার হত্যাকাণ্ড এবং ২০১৬ সালের ১ জুলাই হলি আর্টিজান বেকারি হামলা দেশের নিরাপত্তা, গোয়েন্দা তৎপরতা ও রাজনৈতিক অভিপ্রায়ের প্রশ্ন তোলে। বিদেশি নাগরিক নিহত হওয়ায় ঘটনাটি আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত হয় এবং দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়। বিশ্লেষণে দেখা যায়, হামলাটি ছিল ধর্মীয় উগ্রতা, তরুণদের হতাশা, বিদেশি গোয়েন্দা তৎপরতা ও রাষ্ট্রীয় দুর্বলতার এক জটিল মিশ্রণ। পরবর্তী অভিযান, গ্রেফতার ও ক্রসফায়ার সমাজে অনিরাপত্তা, সন্দেহ ও আতঙ্কের আবহ তৈরি করে।

এরই ধারাবাহিকতায়, ২০২৪-২৫ সালের প্রেক্ষাপটে আমরা ২০১০ সালের পরবর্তীতে প্রায় একই ধরনের ঘটনার মুখোমুখি হচ্ছি। জানুয়ারি ২০২৪ থেকে অক্টোবর ২০২৫ পর্যন্ত সময়ের মধ্যে প্রায় নব্বইটি ধর্ম অবমাননা-সংক্রান্ত ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে বলে পর্যবেক্ষণ দেখা গেছে। এসব ঘটনার বড় অংশ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে উৎপত্তি নিয়ে মাঠ পর্যায়ে বিস্তার লাভ করেছে। অনলাইন-প্ল্যাটফর্মগুলোতে ছড়ানো কিছু পোস্টই মনে হয় দিকনির্দেশিত— কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে। পরবর্তীতে তা মুহূর্তে স্থানীয় সংঘর্ষ, সহিংসতায় রূপ নেয়। একই সময়ে ইসকন ও কয়েকটি সংখ্যালঘু সংগঠনের কার্যক্রম বৃদ্ধি পেয়েছে, বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত এনজিও-গুলোর সক্রিয়তা এবং কিছু প্রভাবশালী বিদেশি মিডিয়ার প্রতিবেদন— সব মিলিয়ে একটি অস্বাভাবিক উত্তেজনার পরিবেশ তৈরি হয়েছে। সম্প্রীতি গাজীপুরের টঙ্গির একটি মসজিদের ইমামকে ইসকনের প্রতিনিধিরা হুমকি দেয়ার পর, পরবর্তীতে সেই ইমামকে পঞ্চগড় থেকে হাত পা শিকল দিয়ে বাঁধা অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। এই ঘটনার প্রতিবাদে খেলাফত মজলিশ এবং ছাত্র জমিয়ত রাজধানীতে বিক্ষোভ মিছিল করে এবং বলে যে ইসকন বাংলাদেশের জন্য অশনিসংকেত। এই সব ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার অনুঘটক হতে পারে।

আরও পড়ুন
বিএনপির কোনো নেতাকর্মী রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত নয়: রিজভী
বিএনপির কোনো নেতাকর্মী রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত নয়: রিজভী
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ‘বাংলাদেশে মৌলবাদের উত্থান’ বা “বাংলাদেশে তালেবায়ন” শিরোনামগুলো এই অভ্যন্তরীণ সংকটকে কূটনৈতিক ও প্রতিচ্ছবি হিসেবে তুলে ধরেছে। এই ধরনের প্রচারণা দেশের ধর্মীয়-সচেতন সামাজিক অংশগুলোর মধ্যে সন্দেহের চোখ আরও বাড়িয়েছে— ধর্মপ্রাণ মানুষকেই সন্দেহের গভীরে ঠেলে দিচ্ছে এবং ধর্মনিরপেক্ষতার নামে কিছু বক্তব্যকে প্রগতিশীলতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা হচ্ছে।

এই ঘটনার পেছনে দেখা গেছে, ধর্ম অবমাননা ও সাম্প্রদায়িক উসকানিমূলক ঘটনাগুলো এককভাবে ঘটে না, এরা প্রায়শই একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক কৌশলের অংশ। একাধিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক, গোয়েন্দা সূত্র ও সমাজবিজ্ঞানীর পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, এসব কার্যক্রম কখনো কখনো একটি সূক্ষ্মভাবে পরিকল্পিত ‘প্রি-জাস্টিফিকেশন’ মেকানিজম হিসেবে কাজ করে— অর্থাৎ, কোনো ঘটনা উসকে দিয়ে পরবর্তীতে কঠোর ব্যবস্থা বা আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপকে যৌক্তিকতা দেওয়া হয়। বাংলাদেশের সেনাবাহিনী নিয়ে বিতর্কও একই সূত্রে গাঁথা বলে অভিজ্ঞ মহল মনে করেন। ইতিহাসও শিক্ষা দিয়েছে যে, ধর্মীয় উত্তেজনা ও বিভাজন কেবল ধর্ম বা বিশ্বাসের সীমাবদ্ধ বিষয় নয়; এগুলো রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা, সামাজিক ঐক্য এবং সার্বভৌমত্বকে চ্যালেঞ্জ করে।

এই বাস্তবতা মোকাবিলায় রাষ্ট্র, বাহিনী, বুদ্ধিজীবী, ধর্মীয় নেতৃত্ব ও নাগরিক সমাজের সমন্বিত উদ্যোগ অপরিহার্য। নীতিগত স্পষ্টতা ও স্বচ্ছ ন্যারেটিভ ঘোষণার মাধ্যমে ধর্ম অবমাননার ঘটনাগুলোকে দ্রুত আইনি পর্যবেক্ষণে আনা প্রয়োজন, যাতে ধর্মীয় অনুভূতিকে উসকে সহিংসতা প্ররোচিত করলে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যায়— এবং একই সঙ্গে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করা যায়— এই সূক্ষ্ম ভারসাম্যই রাষ্ট্রের নীতি-দক্ষতার পরীক্ষা। পাশাপাশি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় কমিটি গঠন জরুরি, যেখানে সরকার, সাইবার ইউনিট, বুদ্ধিজীবী, বিশিষ্ট আলেম, সংখ্যালঘু প্রতিনিধি, মানবাধিকার সংগঠন ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিত্ব থাকবে। নীতি-প্রণয়ন ও মনিটরিংয়ের জন্য এ ধরনের সংগঠন দ্রুত পরিস্থিতি দেখাশোনা করতে পারবে।

আরও পড়ুন
গণভোট ছাড়া জাতীয় নির্বাচন হবে অর্থহীন: জামায়াত আমির
গণভোট ছাড়া জাতীয় নির্বাচন হবে অর্থহীন: জামায়াত আমির
আইনি স্পষ্টতা, স্বচ্ছ তদন্ত, দ্রুত বিচার ও ডিজিটাল ফরেনসিক সক্ষমতা জোরদার করা হলে সামাজিক আস্থা পুনঃস্থাপন সম্ভব। আইনশৃঙ্খলা ও গোয়েন্দা সংস্থাকে সাইবার মনিটরিং বাড়াতে হবে, তবে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও আইনগত প্রক্রিয়ার সীমা রক্ষা করেই— অন্যথায় নিরাপত্তার নামে অতিরিক্ত দমন আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। হটস্পট এলাকায় রিস্ক-ভিত্তিক মধ্যস্থতা টিম ও স্থানীয় ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে ধারাবাহিক সংলাপ স্থানীয় শান্তি রক্ষায় কার্যকর হবে। মিডিয়া ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মের জন্য স্পষ্ট নীতিমালা ও স্বাধীন ফ্যাক্ট চেকিং নেটওয়ার্ক গঠন করলে, ভুয়া তথ্য দ্রুত শনাক্ত ও বন্ধ করা যাবে। ধর্মীয় নেতৃত্বেরও দায়িত্ব রয়েছে— খুতবা ও বক্তৃতায় উত্তেজনামূলক ভাষা পরিহার এবং ইন্টার-ফেইথ সংলাপের মাধ্যমে পারস্পরিক বিশ্বাস পুনর্গঠন জরুরি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সহনশীলতা-ভিত্তিক পাঠ্যক্রম চালু করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সহাবস্থানমূলক চেতনায় গড়ে তোলা উচিত।

সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সাধারণত ধাপে ধাপে সৃষ্টি হয়— প্রথমে বিভ্রান্তি, পরে সংঘর্ষ, শেষে সহিংসতা। বাংলাদেশের বহুত্ববাদী সমাজে তথ্য যাচাই ও দ্রুত সতর্কতা অত্যাবশ্যক। স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গুজব রোধে তাৎক্ষণিক ভূমিকা নিতে পারে। সম্প্রতি এক হিন্দু ছাত্রের বিরুদ্ধে মুসলিম কিশোরী ধর্ষণ ও ভিডিও ছড়ানোর অভিযোগে গ্রেফতার হয়। অনলাইনে প্রচারিত কিছু ভুয়া ভিডিওও উত্তেজনা বাড়ায়, যেমন, নারায়ণগঞ্জে এক নারীকে হিন্দু পরিচয়ে ভিডিও ছড়ানো হলেও ‘রিউমার-স্ক্যানার’ তা মিথ্যা প্রমাণ করে। এই ধরনের ঘটনা দ্রুত সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করে। মাজার, দরগা ও ধর্মীয় স্থাপনার মূর্তি ভাঙচুর বেড়েছে, যা উগ্রবাদী কার্যক্রমকে উসকে দিচ্ছে এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে ক্ষুণ্ন করছে। এসব শুধু উত্তেজনাই নয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর ভাঙনের ইঙ্গিতও দেয়। বিতাড়িত স্বৈরাচারী আওয়ামী সরকারের ইন্ধনমূলক কার্যক্রম এই অস্থিতিশীলতাকে আরও গভীর করছে।

ভারতের কিছু রাজনৈতিক দল ও গণমাধ্যমে বাংলাদেশের ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতি ব্যবহার হচ্ছে বলে অভিযোগ আছে, যা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ভারতের সাবেক পররাষ্ট্রসচিব জেএন ডিক্সিট একবার বলেন, “বাংলাদেশের রাজনৈতিক শক্তি যদি ভারতের স্বার্থের পরিপন্থি হয়, তাহলে সে বিষয়ে নাক গলানোকে ভারত নিজের দায়িত্ব মনে করবে।” ২০২১ সালের অক্টোবরে ঢাকায় সফরকালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্করও বলেন, “বাংলাদেশে ভারতের স্বার্থবিরোধী মৌলবাদী সরকারকে আমরা মেনে নেব না।” এ বক্তব্যে দেশজুড়ে আলোচনার ঝড় ওঠে এবং ভারতের হস্তক্ষেপের অভিযোগ জোরালো হয়।

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের আওয়ামী স্বৈরশাসক ও তার ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের সম্পর্কও সাম্প্রদায়িক অস্থিতিশীলতায় ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করা হয়। আওয়ামী সরকারকে অবৈধভাবে ক্ষমতা রাখার সব ব্যবস্থা করে বিনিময়ে ভারত বিভিন্ন সুবিধা নিয়েছে বাংলাদেশ থেকে। পরবর্তীতে চব্বিশের জুলাই বিপ্লবে আওয়ামী সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়ে প্রায় সব নেতারা ভারতে আশ্রয় নিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করছে। নিজেদের পছন্দের সরকার আনার লক্ষ্যে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করে রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়ানো তাদের কৌশলের অংশ হয়ে উঠেছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি অংশও প্ররোচনায় পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে— অসুরের মুখে দাড়ি, পোশাক, বা নাম নিয়ে ব্যঙ্গ করছে। এর মাধ্যমে ধর্মভিত্তিক সন্দেহ ও বিভাজন তৈরির চেষ্টা চলছে, যা জাতীয় সম্প্রীতির জন্য গুরুতর হুমকি।

আরও পড়ুন
বাংলাদেশের নির্বাচনে আ.লীগকে রাখার প্রস্তাব দেবে ভারত? যা জানা গেল
বাংলাদেশের নির্বাচনে আ.লীগকে রাখার প্রস্তাব দেবে ভারত? যা জানা গেল
সম্প্রতি প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের চেহারার আদলে তৈরি “অসুর” চরিত্র ব্যবহার করে সামাজিক মাধ্যমে যে প্রচারণা চলছে, তা সাম্প্রদায়িকতা উসকে দেওয়ার স্পষ্ট প্রচেষ্টা। এতে একদিকে নোবেলজয়ী ব্যক্তিত্ব, বাংলাদেশ সরকারের প্রধানকে অবমাননা করা হয়েছে, অন্যদিকে ধর্মীয় আবেগকে কাজে লাগিয়ে সমাজে বিভাজন ও অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে— যা রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতার জন্য মারাত্মক হুমকি। এভাবে আন্তর্জাতিক ও ভারতীয় রাজনৈতিক ও মিডিয়া-চক্রগুলোর ভূমিকা বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক উত্তেজনায় একটি সার্বভৌম ন্যারেটিভ তৈরি করেছে, যা শুধুই অভ্যন্তরীণ ঘটনাবলি নয়, অঞ্চলের বৃহত্তর রাজনৈতিক এবং ভূ-রাজনৈতিক পরিণতিগুলোরও অংশ। অর্থাৎ ভারত এই বিষয়টিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে বৈধতা দিচ্ছে, নাক গলানো মনে করছে না।

এমন অনেক ভাবেই বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি হচ্ছে, যা মোকাবিলায় প্রয়োজন এক বহুমাত্রিক কৌশল। প্রথমত, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও গণমাধ্যমে ছড়ানো গুজব ও ভুল তথ্য দ্রুত যাচাই ও প্রতিক্রিয়া দেওয়া জরুরি। এজন্য তথ্য যাচাই কেন্দ্র স্থাপন ও জনগণকে সচেতন করার মাধ্যমে প্রাথমিক পর্যায়েই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, আইন ও নীতি-প্রণয়নে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে— সাম্প্রদায়িক সহিংসতা বা উসকানির দ্রুত বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত করলে জনগণের আইনের প্রতি আস্থা বাড়বে। তৃতীয়ত, যুবসমাজ ও স্থানীয় জনগণকে শান্তি-শিক্ষা ও সামাজিক দায়িত্ববোধে প্রশিক্ষিত করা প্রয়োজন, যেন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সমাজকল্যাণ সংগঠন ও স্থানীয় কমিটিগুলো নেতৃত্ব দিতে পারে। স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও সহিংসতার আগে সতর্কতা, দ্রুত নিয়ন্ত্রণ ও তথ্য প্রচারে সক্রিয় ভূমিকা নিতে পারে।

সর্বোপরি, দেশের ধর্মীয় নেতা ও সম্প্রদায়ের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মাধ্যমে আন্তঃসম্প্রদায়িক সংলাপ বাড়ানো দরকার— যা মতবিরোধ কমিয়ে সহমর্মিতা ও পারস্পরিক বিশ্বাস জোরদার করে। ইসলাম শান্তি, ন্যায় ও সহাবস্থানের ধর্ম। কোরআনে বলা হয়েছে, “হে মানবজাতি! আমি তোমাদেরকে এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি… আল্লাহর নিকটে সেই ব্যক্তি অধিক সম্মানিত, যে সর্বাধিক মুত্তাকি।” (আল-হুজুরাত, আয়াত ১৩)। আবার বলা হয়েছে, “ধর্মের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই।” (আল-বাকারা, আয়াত ২৫৬)। নবি করিম (সা.) মদিনায় মুসলিম, ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের নিয়ে “মদিনা সনদ” প্রতিষ্ঠা করেন— যা ছিল প্রথম আন্তঃধর্মীয় সংবিধান। কোরআনে দাঙ্গাকে বলা হয়েছে ‘ফিতনা’—“ফিতনা হত্যার চেয়েও ভয়াবহ।” (আল-বাকারা, আয়াত ১৯১)। তাই মুসলমানের কর্তব্য হলো : শান্তি রক্ষা ও গুজব-উত্তেজনা থেকে বিরত থাকা। রাসূল (সা.) বলেন, “যে ব্যক্তি কোনো অমুসলিমকে কষ্ট দেয়, আমি কেয়ামতের দিন তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেব।” তিনি আরও বলেন, “কোনো জাতি বা বর্ণ অন্য জাতির উপর শ্রেষ্ঠ নয়, কেবল তাকওয়া ছাড়া।” এসব প্রমাণ করে ইসলাম সমতা ও মানবিকতার ধর্ম।

উপসংহারে বলা যায়, সাম্প্রদায়িক শান্তি ও সামাজিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় সরকার, প্রশাসন, ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ ও সাধারণ জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টা অপরিহার্য। তথ্য যাচাই, সংলাপ, আইন প্রয়োগ, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ একত্রে কার্যকর হলে উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণসহ দেশের দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা সম্ভব। বিশেষ করে ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের সতর্ক থাকতে হবে— দেশবিরোধী ও আধিপত্যবাদী শক্তি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ফাঁদ পেতে রাজনৈতিক সুবিধা নিতে পারে, সেই ফাঁদে পা দেওয়া চলবে না।

লেখক : অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ক

বাংলাদেশ ইসলাম

shaplanews.com


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ