
ঋণের উচ্চ সুদহার, নির্মাণসামগ্রীর উচ্চমূল্য, শুল্ক-করের বোঝা, নীতিগত অনিশ্চয়তা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতায় কঠিন সময় পার করছে দেশের আবাসন খাত। ব্যবসায়ীদের হিসাবে, এক বছরের ব্যবধানে অ্যাপার্টমেন্ট বা ফ্ল্যাট বিক্রি কমেছে ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ। উদ্যোক্তাদের অনেকেই নতুন প্রকল্পে হাত দিচ্ছেন না। কেউ কেউ প্রকল্প সম্পন্ন করলেও ক্রেতা পাচ্ছেন না। তবে বিক্রি কমলেও সেই তুলনায় ফ্ল্যাটের দাম কমেনি।
এমন পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ীরা বলছেন, আবাসন খাতের সংকট কাটাতে ফ্লোর এরিয়া রেশিও বা ফারের মতো বিষয়গুলোর সময়োপযোগী সংস্কার ও ত্রুটি সংশোধন করতে হবে। জরুরি ভিত্তিতে গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট নিরসন করা দরকার। এ খাতের জন্য সহজ ঋণ ও বিশেষ তহবিল গঠন করতে হবে। তারা বলছেন, জমির মালিকদের ওপর কর আরোপ এই খাতকে ভয়াবহ ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
আবাসন খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, রাজউকের বিভিন্ন নীতিমালার কারণে আবাসন খাতে এক ধরনের অশান্ত পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। ড্যাপের নতুন নিয়মের কারণে দু-তিন বছর ধরে ডেভেলপাররা ঢাকার মূল কেন্দ্রে নতুন প্রকল্প নিতে পারছেন না। বাধ্য হয়ে ঢাকার প্রান্তিক অঞ্চলে প্রকল্প নিচ্ছেন। সেখানেও ক্রেতা নেই। ফলে প্রকল্পগুলোতে বিপুল বিনিয়োগ আটকে যাওয়ায় ডেভেলপাররা বিপাকে পড়েছেন। অন্যদিকে সম্প্রতি সুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্লান্ট (এসটিপি) স্থাপন নিয়ে বেশ হইচই হচ্ছে। মূলত এটি ওয়াসার কাজ হলেও রাজধানীর গুলশান বা বনানীর মতো এলাকার বাড়িগুলোর পার্কিংয়ের জায়গায় নিজ উদ্যোগে এসটিপি স্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যা অগ্রহণযোগ্য। তাদের মতে, আবাসনকে মানুষের ক্রয়সীমার মধ্যে আনতে হলে নারায়ণগঞ্জ, পুবাইল, বছিলা, কেরানীগঞ্জ, আশুলিয়া বা সাভারের মতো এলাকাগুলোতে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
আবাসন খাতের ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিহ্যাব সূত্রে জানা গেছে, দেশে প্রায় ১১শ আবাসন প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান বছরে আট থেকে ১০ হাজার অ্যাপার্টমেন্ট তৈরি করে। এ খাতের সঙ্গে প্রায় ২৬৯টি লিংকেজ শিল্প প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত। ফলে এ খাতের গতি কমে গেলে শুধু ডেভেলপার বা ক্রেতারা নন; রড, সিমেন্ট, সিরামিক, বৈদ্যুতিক সামগ্রী, আসবাব, পরিবহনসহ বিভিন্ন খাতে লাখো মানুষের কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সংগঠনটির মতে, গত এক বছরে নির্মাণসামগ্রীর দাম বেড়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ। অন্যদিকে অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রি কমেছে ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ।
এ খাতের ব্যবসায়ীরা বলেন, ২০২০ সালে করোনা অতিমারির সময় আবাসন ব্যবসায় ধস নামে। এরপর দ্রুত ঘুরে দাঁড়ালেও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ফের স্থবিরতা নিয়ে আসে। তখন ডলারের দাম অস্বাভাবিক বাড়লে এর প্রভাব পড়ে নির্মাণসামগ্রীর বাজারে। হুহু করে বাড়তে থাকে রড-সিমেন্টসহ নির্মাণ খাতের পণ্যের দাম। সব মিলিয়ে আবাসান খাতে স্থবিরতা কাটছেই না। ২০২২ সালের আগস্টে রাজউক ঢাকা মহানগরের জন্য নতুন ড্যাপ কার্যকর করে। আগে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ভবনের যে আয়তন পাওয়া যেত, এখন সেই তুলনায় কম পাওয়া যাচ্ছে। ফলে জমির মালিকদের আবাসন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাড়ি বানাতে আগ্রহ কমছে।
এ ছাড়া ফ্ল্যাট ও জমি নিবন্ধনে ১৩ শতাংশের বেশি ব্যয় হওয়ায় কেনাবেচা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। জমির মালিকদের দেওয়া সাইনিং মানির ওপর ১৫ শতাংশ কর রয়েছে। জমির মালিক ডেভেলপারের কাছ থেকে যে ফ্ল্যাট পাবেন, তার মূল্যেও ১৫ শতাংশ গেইন ট্যাক্স দিতে হবে। এতে আবাসন খাতে নতুন সংকট সৃষ্টি হয়েছে।
তা ছাড়া রড, পিভিসি রেজিন, পেট রেজিন, কোল্ড-রোল্ড কয়েল, কপার তার, কপার টিউবসহ বিভিন্ন নির্মাণ উপকরণের ওপর কর ও শুল্ক বাড়ার কারণে নির্মাণ পণ্যের দাম বেড়েছে। এর প্রভাব পড়ছে ফ্ল্যাটের ওপর। সরকারি সংস্থা টিসিবির তথ্যমতে, বছরের ব্যবধানে প্রধান উপকরণ রডের দামই বেড়েছে ১০ শতাংশ।
ঢাকার বাইরে ক্রেতার আগ্রহ নেই
রিহ্যাবের সাবেক সভাপতি ও দ্য স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেডের (এসইএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আব্দুল আউয়াল সমকালকে বলেন, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি খারাপ থাকায় তার প্রভাব আবাসন খাতেও পড়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি ও তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে নির্মাণসামগ্রীর উৎপাদন খরচ এবং পরিবহন ভাড়া বেড়েছে, যা পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে ফ্ল্যাট নির্মাণের সার্বিক ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে।
তাঁর ভাষ্য, যারা ‘হাই-এন্ড’ বা উচ্চমূল্যের ফ্ল্যাট কিনতেন, তারা বাজার থেকে সরে গেছেন। এখন শুধু মাথার গোঁজার ঠাঁই খুঁজছেন– এমন কিছু ক্রেতাই বাজারে ঘুরছেন। কিন্তু ফ্ল্যাটের দাম যে পর্যায়ে পৌঁছেছে, তাতে ব্যাংকের ঋণ সুবিধা থাকা সত্ত্বেও ক্রেতাদের ফ্ল্যাট কেনা সম্ভব হচ্ছে না।
সংকটেও কারও কারও বিক্রি কিছুটা বেড়েছে
আব্দুল আউয়াল বলেন, কলাবাগান, এলিফ্যান্ট রোড বা ইন্দিরা রোড–এসব এলাকায় ফ্ল্যাটের ব্যাপক চাহিদা থাকলেও কোনো প্রকল্প নেই। কলাবাগানে প্রতি বর্গফুট ১৫ হাজার টাকা
দরেও ক্রেতারা কিনতে প্রস্তুত, কিন্তু সাভারে মাত্র পাঁচ হাজার টাকায়ও কিনতে চায় না। সেখানে তৈরি ফ্ল্যাট পড়ে আছে। ক্রেতা নেই। কারণ স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালত সব
ঢাকায় হওয়ায় মানুষ ঢাকার প্রান্তসীমায় যেতে চায় না।
এই ক্রান্তিকালেও কারও কারও বিক্রি বেড়েছে। এশিউর গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. শেখ সাদি বলেন, বর্তমানে ঢাকায় ভবনের যে প্ল্যান পাস করা হয়, তার নীতিমালা, ফার এবং ড্যাপ সংক্রান্ত পদ্ধতিগুলো অত্যন্ত বাজে অবস্থায় রয়েছে। সংকট কাটাতে হলে ফার এবং ড্যাপের মতো বিষয়গুলোর সময়োপযোগী সংস্কার ও ত্রুটি সংশোধন করা অত্যন্ত জরুরি। তবে বিগত দুই বছরের তুলনায় গত দুই মাসে তাঁর কোম্পানির বিক্রি কিছুটা বেড়েছে বলে জানান তিনি।
এক বছরে বিক্রি কমেছে ৩০ শতাংশ
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাময়িক হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জিডিপিতে সেবা খাতের অবদানে পঞ্চম স্থানে রয়েছে আবাসন উপখাত। সর্বশেষ অর্থবছরে এ খাতে মূল্য সংযোজন হয়েছে দুই লাখ ৭৩ হাজার ৬০২ কোটি টাকা। মোট জিডিপিতে এ খাতের অবদান প্রায় পৌনে ৮ শতাংশ।
বিবিএসের বিল্ডিং ম্যাটারিয়ালস প্রাইস ইনডেক্সের তথ্যমতে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নির্মাণসামগ্রীর ব্যবহারের প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ থেকে কমে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক শূন্য ২ শতাংশে। অর্থাৎ রড-সিমেন্ট, ইট-বালুসহ নির্মাণসামগ্রীর ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। তবে খরচ বেড়েছে পরিবহনে। বিএমপিআইর তথ্যমতে, এক বছরে পরিবহন ব্যয় বেড়েছে ২ দশমিক ২৬ শতাংশ।
আবাসন ব্যবসায়ীরা বলেন, এই পরিসংখ্যান বলে এ খাতে কতটা স্থবিরতা রয়েছে। বিটিআইর সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বর্তমান উপদেষ্টা এফ আর খান বলেন, সার্বিকভাবে এ খাতে মন্দাভাব চলছে। এক বছরের ব্যবধানে বেচাবিক্রি কমেছে ৩০ শতাংশের মতো।
নতুন বোঝা এসটিপি
প্রায় এক মাস ধরে গ্যাস-বিদ্যুতের তীব্র সংকট রয়েছে। এতে কেবল আবাসন নয়, পোশাকসহ সব খাতে এর প্রভাব পড়েছে। সম্প্রতি বিদ্যুৎ মন্ত্রী জানিয়েছেন, এ সংকট কাটতে আরও দুই বছর অপেক্ষা করতে হবে। বিদ্যুৎ মন্ত্রীর এমন বক্তব্যে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে বলে মনে করেন।
বিল্ডিং ফর ফিউচার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভিরুল হক প্রবাল। তিনি বলেন, গ্যাস-বিদ্যুতের অভাবে আবাসন খাতের নির্মাণকাজ ব্যাহত হচ্ছে। গার্মেন্ট মালিকরা আবাসন খাতের অন্যতম বড় ক্রেতা, কিন্তু বর্তমানে তাদের ব্যবসাও ভালো যাচ্ছে না।
তানভিরুল হক প্রবাল বলেন, নির্মাণসামগ্রীর দাম বর্তমানে আকাশচুম্বী। এর ওপর বিল্ডিংয়ে সুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্লান্ট (এসটিপি) স্থাপনে বাধ্য করা হচ্ছে। এটি ওয়াসার কাজ হলেও গুলশান বা বনানীর মতো এলাকার প্রতিটি বাড়ির পার্কিংয়ের জায়গায় ব্যক্তি উদ্যোগে এটি স্থাপন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যা অগ্রহণযোগ্য।
আবাসন খাতে ফ্ল্যাট বিক্রি একদম বন্ধ হয়ে গেছে–এমনটি বলা ঠিক হবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, যারা ভালো বা নামকরা ডেভেলপার, তাদের বিক্রি স্বাভাবিকভাবে চলছে। তবে সামগ্রিক বাজারের অবস্থা বেশ খারাপ।
আবাসন খাতকে ‘শিল্প’ ঘোষণার দাবি
আবাসন খাতকে পূর্ণাঙ্গ ‘শিল্প’ হিসেবে ঘোষণা করার দাবি জানিয়েছেন ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি হোসেন খালেদ। তিনি বলেন, এ খাতের সঙ্গে শত শত উপশিল্প জড়িত। এটি রাজস্ব আয়ের অন্যতম বড় উৎস। দুঃখজনকভাবে এ খাতকে শিল্প হিসেবে গণ্য করা হয় না।
হোসেন খালেদ বলেন, ঢাকায় প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ ভাড়া বাসায় থাকেন, মাত্র ২০ শতাংশ মানুষের নিজস্ব আবাসন রয়েছে। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ১০ বছরের বেশি মেয়াদে গৃহঋণ বা অর্থায়ন করে না। অথচ উন্নত দেশগুলোতে কম সুদে ২০ থেকে ৩০ বছর মেয়াদি গৃহঋণ সুবিধা দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, ‘রিয়েল এস্টেট ইনভেস্টমেন্ট ট্রাস্ট’ এবং ‘রিয়েল এস্টেট মর্টগেজ বন্ড’ চালু করে বাজার থেকে অর্থ তুলে আবাসন খাতে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন করা সম্ভব। মধ্যম ও ক্ষুদ্র আকারের ফ্ল্যাটের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীনে ১০ থেকে ২০ হাজার কোটি টাকার কম খরচের তহবিল গঠন করা প্রয়োজন।
অন্যতম বাধা ঋণের উচ্চ সুদ
তীব্র গ্যাস সংকটে রড ও সিমেন্টের মতো আবাসন খাতের অত্যাবশ্যকীয় নির্মাণসামগ্রীর উৎপাদন ভয়াবহভাবে ব্যাহত হচ্ছে বলে জানান রিহ্যাবের সিনিয়র সহসভাপতি আবদুর রাজ্জাক। এক-দেড় বছরের ব্যবধানে ফ্ল্যাট বিক্রি ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কমেছে দাবি করে তিনি বলেন, বর্তমানে হাসপাতাল, ওষুধ কোম্পানি এবং খাদ্য উৎপাদনকারী ছাড়া দেশের প্রায় সব খাতের ব্যবসা কোণঠাসা অবস্থায় রয়েছে।
আবদুর রাজ্জাক বলেন, মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের যারা ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা জমিয়ে বাকি টাকা ব্যাংক ঋণের মাধ্যমে পরিশোধ করে ফ্ল্যাট কিনতে চান, তারা কিনতে পারছেন না। কারণ সুদহার ১৫ শতাংশে পৌঁছেছে। অন্যদিকে যাদের হাতে পর্যাপ্ত টাকা আছে তাদের অনেকের অর্থ দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে।
শহরের কেন্দ্রস্থলে জমির দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে বলে জানান আব্দুর রাজ্জাক। উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, রামপুরা, আফতাবনগরে পাঁচ কাঠা জমির দাম ১০ কোটি টাকা, যেখানে মাত্র ৯টি ফ্ল্যাট তৈরি করা সম্ভব। ফলে জমি বাবদই প্রতিটি ফ্ল্যাটের দাম দাঁড়ায় কোটি টাকার বেশি। এর সঙ্গে নির্মাণ খরচ যুক্ত হলে ফ্ল্যাটের দাম দাঁড়ায় দুই-আড়াই কোটি টাকা, যা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে।
Kaderabad Housing Mohmmedpur, Dhaka-1207. Phone- 01778840333
Email: m.r.01778840333@gmail.com
Web: www.shaplanews.com
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬