বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান মাসুদ খান বলেছেন, বিশ্বেও কোথাও বন্ধ কোম্পানির শেয়ার লেনদেন করতে দেওয়া হয় না। তাই বাংলাদেশের শেয়ারবাজারেও উৎপাদন বন্ধ বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার লেনদেন বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
আজ বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) রাজধানীর পুরানা পল্টনে ক্যাপিটাল মার্কেট জার্নালিস্টস ফোরামের (সিএমজেএফ) আয়োজিত ‘সিএমজেএফ টক’ অনুষ্ঠানে বিএসইসি চেয়ারম্যান এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সিএমজেএফের সভাপতি মনির হোসেন। সঞ্চালনায় ছিলেন সাধারণ সম্পাদক আহসান হাবিব রাসেল।
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, অনিয়মকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর শাস্তি নিশ্চিত করতে আইনি কাঠামোতেও পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা করছে সংস্থাটি।
মাসুদ খান বলেন, পুঁজিবাজারের উন্নয়নে আরও কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে- পুঁজিবাজারে সংস্কারের অংশ হিসেবে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) প্রক্রিয়া সহজ করা, ডাইরেক্ট লিস্টিংয়ের সুযোগ বাড়ানো, মার্জিন ঋণের বিধিমালা শিথিল করা, টি+১ সেটেলমেন্ট চালু, বন্ড বাজারকে মূল মার্কেটে আনা এবং ডেরিভেটিভস চালু অন্যতম।
বিএসইসির চেয়ারম্যান বলেন, পুঁজিবাজারের ব্যবস্থাপনায় ইতোমধ্যে পরিবর্তন এসেছে। বাজার তদারকিতে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জকে (ডিএসই) ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। আগে কোনো শেয়ারের অস্বাভাবিক দাম বা লেনদেনের ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নিতে ডিএসইকে কমিশনের অনুমোদনের জন্য অপেক্ষা করতে হতো। এখন তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ দিতে ডিএসইকে প্রয়োজনীয় ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে সার্কিট ব্রেকার নির্ধারণের ক্ষমতাও স্টক এক্সচেঞ্জের হাতে দেওয়া হয়েছে। তাদের ক্ষমতা আরও বাড়ছে।
বিএসইসির চেয়ারম্যান আরও বলেন, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা কোম্পানির শেয়ার লেনদেন বন্ধ করার উদ্যোগও নেওয়া হবে। মিউচুয়াল ফান্ডকে শক্তিশালী না করলে দেশের পুঁজিবাজারও শক্তিশালী হবে না। কারণ অধিকাংশ খুচরা বিনিয়োগকারীর পক্ষে ভালো কোম্পানি বাছাই করা কঠিন। তাই বিদেশের আদলে ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাডভাইজার সনদ চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। একইসঙ্গে মিউচুয়াল ফান্ডের বিধিমালায়ও পরিবর্তন আনা হবে। তিনি জানান, মার্জিন ঋণ এবং পাবলিক ইস্যু বিধিমালাও সংশোধন করা হবে। বর্তমানে আইপিওতে আসতে উদ্যোক্তাদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয় এবং বিপুল কাগজপত্র জমা দিতে হয়। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান ব্যাংক ঋণকেই সহজ বিকল্প হিসেবে বেছে নেয়। একারণে আইপিও প্রক্রিয়া সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মাসুদ খান বলেন, ভবিষ্যতে ইউনিলিভার ও ইনসেপটার মতো বড় কোম্পানিকে ডাইরেক্ট লিস্টিংয়ের সুযোগ দেওয়া হবে। বর্তমানে শুধু রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি ২৫ শতাংশ শেয়ার ছাড়ার মাধ্যমে এ সুবিধা পায়। নতুন ব্যবস্থায় সব ধরনের কোম্পানি ১০ শতাংশ শেয়ার অফলোড করেই ডাইরেক্ট লিস্টিং করতে পারবে।
বিএসইসির চেয়ারম্যান বলেন, বর্তমান মার্জিন ঋণ নীতিমালায় এত বেশি শর্ত রয়েছে যে বিনিয়োগকারীদের জন্য ঋণ নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। আগামী সপ্তাহেই এ সংক্রান্ত নতুন বিধিমালার খসড়া প্রকাশ করা হবে। গেজেট প্রকাশের পর মার্জিন ঋণ পাওয়া আরও সহজ হবে।
বিএসইসির চেয়ারম্যান আরও বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর সমালোচনা সত্ত্বেও ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের ভাবমূর্তি রক্ষায় লন্ডনে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের তালিকাচ্যুতি ঠেকাতেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাজারে শেয়ার লেনদেনের পর নিষ্পত্তিতে সময় কমানো হবে। বর্তমানে ২ দিনে লেনদেন নিষ্পত্তি হয়। এটি কমিয়ে টি+১ অর্থাৎ একদিনে আনার উদ্যেগ নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক কাজ করছে। পুঁজিবাজারে অনিয়মকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তি নিশ্চিত করতে আইনি পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মাসুদ খান বলেন, বর্তমানে বিএসইসি জরিমানা করলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা আদালতে আটকে যায়। অতীতের একটি কমিশন প্রায় এক হাজার ৫০০ কোটি টাকা জরিমানা করলেও আদায় হয়েছে মাত্র ৩৩ লাখ টাকা। এ পরিস্থিতি বদলাতে বিশেষ বেঞ্চ গঠন এবং পুঁজিবাজার-সংক্রান্ত ট্রাইব্যুনালে সরাসরি মামলা করার ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বন্ড বাজারকে সক্রিয় করতে বর্তমানে অল্টারনেটিভ ট্রেডিং বোর্ডে থাকা বন্ডগুলোকে মূল মার্কেটে তালিকাভুক্ত করার পরিকল্পনার কথাও জানান। পাশাপাশি ডেরিভেটিভস চালুর প্রস্তুতি চলছে বলেও উল্লেখ করেন।
ডিএসইর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরিচ্যুতির বিষয়ে মাসুদ খান বলেন, কর্মী নিয়োগ ও চাকরিচ্যুতির ক্ষমতা ডিএসইর নিজস্ব। এ বিষয়ে বিএসইসির হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই। তবে বিএসইসি থেকে চাকরি হারানো ব্যক্তিদের বিষয়ে চলতি মাসের মধ্যেই একটি সমাধান হবে।শেয়ারবাজারের অপরাধীদের জেল ও আর্থিক জরিমানা নিশ্চিতে কমিশন কাজ করছে বলে জানিয়ে মাসুদ খান বলেন, কারণ বর্তমানে বিএসইসি জরিমানা ও শাস্তি দিলেও তা আদালতে আটকে যায়। এ কারণে বিগত কমিশন ১৫০০ কোটি টাকা জরিমানা করলেও আদায় হয়েছে মাত্র ৩৩ লাখ টাকা। এ সমস্যা সমাধানে বিএসইসি এরইমধ্যে আদালতে বিশেষ বেঞ্চ করার উদ্যোগ নিয়েছে। এছাড়া শেয়ারবাজার বিষয়ক ট্রাইবুন্যালে
সরাসরি মামলা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
