ঢাকায় অপরাধ নিয়ন্ত্রণে চ্যালেঞ্জে পুলিশ

 

শাপলানিউজ.কম

ঢাকায় একের পর এক খুন, ছিনতাই, কিশোর গ্যাংয়ের তাণ্ডব, মাদক ও সংঘবদ্ধ অপরাধের ঘটনায় বাড়ছে নগরবাসীর উদ্বেগ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত অভিযান, বিশেষ চেকপোস্ট, গোয়েন্দা নজরদারি এবং ব্যাপক গ্রেফতারের পরও অপরাধ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি বলে মনে করছেন অনেকেই। সম্প্রতি আলোচিত কয়েকটি হত্যাকাণ্ড ও ছিনতাইয়ের ঘটনায় রাজধানীবাসীর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুন থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত এক বছরে রাজধানীতে বিভিন্ন অপরাধে ১৬ হাজার ৯২৬টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় গ্রেফতার হয়েছেন ৪০ হাজার ৯৮৯ জন। সরকারি পরিসংখ্যানে অপরাধ কমার দাবি করা হলেও বাস্তব পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ কাটছে না সাধারণ মানুষের।

সাম্প্রতিক কয়েকটি আলোচিত ঘটনাচলতি বছরের ১২ এপ্রিল বিকেল সাড়ে ৪টা। রাজধানীর মোহাম্মদপুর থানাধীন রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী বেড়িবাঁধ সড়কের ঢালে কুপিয়ে হত্যা করা হয় কিশোর গ্যাং এলেক্স ইমন গ্রুপের মূল হোতা ইমন ওরফে এলেক্স ইমনকে। তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থল থেকে তিনজনকে গ্রেফতারও করে পুলিশ। একই সঙ্গে তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় দেশীয় অস্ত্র।

৮ জুন রাত ৮টার দিকে রাজধানীর মৌচাকের আনারকলি মার্কেটের সামনে দুর্বৃত্তের ছুরিকাঘাতে রমনা থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক আহ্বায়ক বিল্লাল হোসেন তালুকদার নামের এক ব্যক্তি নিহত হন।

এক জেলায় অপরাধ, অন্য জেলায় আত্মগোপন৯ জুন রাত সোয়া ১টার দিকে পূর্ব শেওড়াপাড়া দিয়ে মোটরসাইকেলে বাসায় ফিরছিলেন সাজিদ চৌধুরী রাফি। আগে থেকে ওত পেতে থাকা একজন তাকে থামার সংকেত দেন। তিনি না থামলে আরেকজন চলন্ত মোটরসাইকেলে ইট ছুড়ে আঘাত করেন। এতে রাফি রাস্তায় পড়ে যান। পরে তাকে একটি অটোরিকশায় করে নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। আর হামলাকারীরা মোটরসাইকেলটি নিয়ে চলে যান। ঘটনার পরপরই পুলিশ তৎপর হয়ে মোটরসাইকেলটি উদ্ধারও করে। গ্রেফতার হয় আসামিও। পরে এ ঘটনায় ২২ জুন সকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন সেই মোটরসাইকেলচালক সাজিদ চৌধুরী রাফি।

এক বছরে প্রায় ১৭ হাজার মামলাঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য বলছে, এক বছরে ঢাকায় বিভিন্ন অপরাধে ১৬ হাজার ৯২৬ মামলা ও ৪০ হাজার ৯৮৯ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ফলে খুন, ছিনতাই, চুরি, ডাকাতি, মাদক, কিশোর গ্যাং, চাঁদাবাজি, প্রতারণা থেকে শুরু করে সাইবার অপরাধ সব মিলিয়ে রাজধানীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।

মামলা দিয়ে দুই ধরনের কাজ হয়। একটা হচ্ছে রিকভারি, মাদক উদ্ধারের জন্য মামলা হয়। মাদক উদ্ধারের বিরুদ্ধে মামলাগুলো আমরা অ্যাপ্রিশিয়েট করি অলওয়েজ। তো যার কারণে মামলার সংখ্যা বাড়ে।

ডিএমপির ৮টি বিভাগের ৫০টি থানার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের জুন থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত এক বছরে বিভিন্ন অপরাধে মামলা হয়েছে ১৬ হাজার ৯২৬টি। এসব মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছে ৪০ হাজার ৯৮৯ অপরাধীকে। অর্থাৎ ঢাকায় প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪৬টি মামলা এবং ১১২ জনের বেশি অপরাধী গ্রেফতার হয়েছে।

সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য যেখানেই থাকুক নির্মূল করা হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসম্প্রতি পুলিশ সদর দপ্তরে এক সংবাদ সম্মেলনে সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য যেখানেই থাকুক সেগুলো নির্মূল করা হবে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, ‘সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য যেখানেই থাকুক, সেগুলো নির্মূল করা হবে। আমরা আশা করি, আপনারা সবাই সহযোগিতা করবেন এবং সমাজের সর্বস্তরের মানুষ আমাদের এ উদ্যোগকে সমর্থন ও সহযোগিতা করবেন। আমরা এ দেশে কোনোভাবেই সন্ত্রাসী, মাদক ব্যবসায়ী এবং চাঁদাবাজদের স্থান দেব না।’

পুলিশের তৎপরতা: এআই নির্মিত ছবি

পরে ৮ জুন সচিবালয়ের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আমাদের দায়িত্ব গ্রহণের তিন মাস পূর্ণ হয়েছে। এ সময়ের তথ্য গত বছরের একই সময়ের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। আমার কাছে যে পরিসংখ্যান এসেছে, তাতে দেখা গেছে ২০২৫ সালের তুলনায় অপরাধ পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। প্রায় প্রতিটি ক্যাটাগরিতেই অপরাধ কমেছে।’

বিভাগভিত্তিক অপরাধ চিত্রডিএমপির বিভাগভিত্তিক অপরাধ ও আসামি গ্রেফতারের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, মামলার সংখ্যা ও আসামি গ্রেফতারের দিক থেকে প্রথম অবস্থানে রয়েছে তেজগাঁও বিভাগ। আর মামলায় দ্বিতীয় অবস্থানে মতিঝিল থাকলেও আসামি গ্রেফতারে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে রমনা।

যেসব কারণে বাড়ছে অপরাধ২০২৫ সালের জুন মাস থেকে চলতি বছরের জুন মাস পর্যন্ত রমনা বিভাগে মোট ১ হাজার ৪৯৮টি মামলা হয়। এসব মামলায় ৮ হাজার ৭৬ জন অপরাধীকে গ্রেফতার করা হয়। এছাড়া লালবাগ বিভাগে ১ হাজার ২২০ মামলায় গ্রেফতার ১ হাজার ৪৯৯ জন। ওয়ারী বিভাগে ২ হাজার ৬৬৫ মামলায় গ্রেফতার ৩ হাজার ১৮২ জন, মতিঝিল বিভাগে ২ হাজার ৭২৭ মামলায় গ্রেফতার ৫ হাজার ৫৯৪ জন, তেজগাঁও বিভাগে ২ হাজার ৭৫৩ মামলায় গ্রেফতার ১৩ হাজার ৫০৬ জন, মিরপুর বিভাগে ২ হাজার ১৪৪ মামলায় গ্রেফতার ৩ হাজার ১৬৯ জন, গুলশান বিভাগে ২ হাজার ১৫৮ মামলায় গ্রেফতার ৩ হাজার ৭৭ জন, উত্তরা বিভাগে ১ হাজার ৭৬১ মামলায় গ্রেফতার ২ হাজার ৮৮৬ জন।

অপরাধের বাস্তবতা, মামলার সংখ্যা এবং গ্রেফতারের পরিসংখ্যানের মধ্যে অনেক ক্ষেত্রেই সামঞ্জস্য দেখা যায় না। অনেক অপরাধী গ্রেফতারের পর দ্রুত জামিনে বের হয়ে আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন। আবার অনেক মামলায় অপরাধের গুরুত্ব যথাযথভাবে উপস্থাপন না হওয়ায় সহজে জামিন পাওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

বাইরের এলাকা থেকে এসে অপরাধ ঘটাচ্ছে চক্রঅপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও আসামি গ্রেফতারের বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. ইবনে মিজান  বলেন, আমরা অভিযানের ফ্রিকোয়েন্সি বাড়িয়েছি। আগে হয়তো সপ্তাহে এক দুবার ব্লক রেইড করতাম, এখন মোটামুটি একদিন পর পরই দেখা যাচ্ছে যে অপরাধ প্রবণ এলাকাকে টার্গেট করে আমরা ব্লক রেইড করি।

ঢাকার অপরাধচিত্র

মোহাম্মদপুরকেন্দ্রিক যে অপরাধগুলো ঘটছে সবগুলো ঘটনা আশেপাশের জেলা উপজেলা থেকে এসে অপরাধ ঘটায় আবার চলে যায়। এলেক্স ইমনের (কিশোর গ্যাং দলনেতা) বিষয়টা যদি মনে করেন, তারা কেরানীগঞ্জ থেকে এসে মোহাম্মদপুরে কুপিয়ে চলে যায়। আশপাশে যে থানাগুলো সাভার, আশুলিয়া, কেরানীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, মানিকগঞ্জ এসব এলাকা থেকে এসে তারা অপরাধ করে আবার নিজ নিজ এলাকায় চলে যায়। মোহাম্মদপুরকেন্দ্রিক অপরাধের ঘটনায় আমরা অপরাধীদের সব এলাকা থেকে ধরছি। মাঝে ভোলায় গিয়ে আসামি ধরে নিয়ে আসাও হয়েছে। আমাদের এই অভিযানের ফলেই তারা এখানে থাকতে পারছে না। আমরা অভিযান অব্যাহত রাখছি।

মাদক উদ্ধারের মামলায় বাড়ে পরিসংখ্যানমতিঝিল বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ বলেন, মামলা দিয়ে দুই ধরনের কাজ হয়। একটা হচ্ছে রিকভারি, মাদক উদ্ধারের জন্য মামলা হয়। মাদক উদ্ধারের বিরুদ্ধে মামলাগুলো আমরা অ্যাপ্রিশিয়েট করি অলওয়েজ। তো যার কারণে মামলার সংখ্যা বাড়ে।

কিশোর অপরাধ: সভ্যতা যেন দেউলিয়ার পথেতিনি বলেন, অপরাধীদের বিরুদ্ধে আমাদের চেকপোস্ট যেগুলো আছে সেই চেকপোস্টগুলো জোরদার করা হয়েছে। এতে এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো থাকে। যারা দুর্বৃত্ত থাকে তারা সহজে অপরাধ করার সাহস করে না। পাশাপাশি দিনের টহল, রাতের টহল, বিশেষ করে ভোরে যেহেতু অপরাধ সংঘটিত হয় তখন তদারকি ডিউটি এবং টহল জোরদার করা হয়েছে। ফলে তুলনামূলকভাবে আমরা ধারণা করছি এবং এলাকাবাসীর কাছ থেকে ফিডব্যাক পাচ্ছি যে আগের চেয়ে বর্তমানের সিচুয়েশন বেশ ভালো।

অন্যদিকে অপরাধ সংঘটিত হলে জড়িতদের গ্রেফতার করে আদালতে সোপর্দ করা হচ্ছে। ঢাকা বিশ্বের অন্যতম বড় শহর। কিন্তু সে তুলনায় আমাদের জনবল, যানবাহন ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা সীমিত। এসব বাড়ানো গেলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ আরও কার্যকর হবে।

অপরাধের আগে ও পরে—দুইভাবেই কাজ করছে পুলিশডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার নিয়াজ মেহেদী বলেন, পুলিশের কার্যক্রম মূলত দুই ধরনের। এক প্রতিরোধমূলক এবং দুই অপরাধ সংঘটনের পরবর্তী ব্যবস্থা। বিট পুলিশিংয়ের মাধ্যমে জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, ইমাম, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে নিয়ে অপরাধ প্রতিরোধে সচেতনতা ও নজরদারি তৈরি করা হচ্ছে।

অন্যদিকে অপরাধ সংঘটিত হলে জড়িতদের গ্রেফতার করে আদালতে সোপর্দ করা হচ্ছে। ঢাকা বিশ্বের অন্যতম বড় শহর। কিন্তু সে তুলনায় আমাদের জনবল, যানবাহন ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা সীমিত। এসব বাড়ানো গেলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ আরও কার্যকর হবে।

পরিসংখ্যান ও বাস্তবতার মধ্যে ফারাকঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক জাগো নিউজকে বলেন, অপরাধের বাস্তবতা, মামলার সংখ্যা এবং গ্রেফতারের পরিসংখ্যানের মধ্যে অনেক ক্ষেত্রেই সামঞ্জস্য দেখা যায় না। অনেক অপরাধী গ্রেফতারের পর দ্রুত জামিনে বের হয়ে আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। আবার অনেক মামলায় অপরাধের গুরুত্ব যথাযথভাবে উপস্থাপন না হওয়ায় সহজে জামিন পাওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

সংঘবদ্ধ অপরাধ মোকাবিলায় করণীয়তিনি বলেন, পুলিশের গৃহীত পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়নে সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে। পাশাপাশি আইন প্রয়োগ করতে গিয়ে অনেক সময় পুলিশ সদস্যরাও হামলার শিকার হন। এসব ঘটনায় কার্যকর ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা না নেওয়া হলে অপরাধীরা পরোক্ষভাবে উৎসাহিত হয়।

তিনি আরও বলেন, শুধু নিয়মিত অভিযান নয়, পুলিশের মনোবল বৃদ্ধি, অভ্যন্তরীণ সমন্বয় জোরদার এবং অপরাধ দমনে নতুন চিন্তা ও কৌশল প্রয়োজন। অন্যথায় সরকারি বক্তব্য, অপরাধ পরিসংখ্যান এবং বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে ব্যবধান থেকেই যাবে।