ভেনেজুয়েলায় শক্তিশালী জোড়া ভূমিকম্পে মারাত্মক বিপর্যয়ের পর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, রিখটার স্কেলে যদি সাত মাত্রার ভূমিকম্প হয়, সেই ধাক্কা সামলাতে পারবে তো ঢাকা? তেমনটি হলে ধসে পড়বে কয়েক হাজার ভবন, মৃত্যু হবে অন্তত দুই থেকে তিন লাখ মানুষের। এমনটাই মনে করছেন ভূমিকম্প বিশ্লেষকরা।
২০১৬ সালের ৪ জানুয়ারি ৬ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে কেঁপে উঠেছিল বাংলাদেশ। সেবার আতঙ্কেই মারা যান ৬ জন। গত বছরের নভেম্বরে নরসিংদীতে ৫ দশমিক ২ মাত্রার একটি ভূমিকম্প হয়েছিল। তখনও দুই শিশুসহ ৬ জনের মৃত্যু হয়েছিল। বিভিন্ন জেলায় আহত হয়েছিল কয়েকশ মানুষ।
গত সোমবার (২২ জুন) রাতেও ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মৃদু ভূমিকম্প অনুভূত হয়। রিখটার স্কেলে ৪ মাত্রার এই ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে, যা ঢাকার আগারগাঁও থেকে মাত্র ১৬ কিলোমিটার দূরে। ঢাকার এত কাছে পরপর ভূমিকম্পের উৎসস্থল হওয়া নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে বিশেষজ্ঞদের।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ছোট ভূমিকম্পগুলো বড় ভূমিকম্পের আলামত। আবার বড় ভূমিকম্পের শত বছরের মধ্যে আরেকটি বড় ভূমিকম্প হয়। সে দিক থেকেও আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বড় ধরনের ভূমিকম্পের আশঙ্কা প্রকট।
২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে ডয়েচে ভেলের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভূতত্ত্ববিদরা বলছেন, ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগের পর নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে প্রয়োজনীয় খোলা জায়গা নেই ঢাকা শহরে। ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) মেনে চলার নির্দেশনা থাকলেও রাজধানীর বেশির ভাগ ভবন মালিকই তা মানছেন না। এ বিষয়ে আইন হওয়ার প্রায় ১৮ বছর পরও এটি ঠিকমতো বাস্তবায়ন না হওয়ায় রাজধানীতে বাড়ছে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন এবং ভূমিকম্পে ক্ষতির আশঙ্কা।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মেহেদী আহমেদ আনসারি ডয়চে ভেলেকে বলেন, গত দু-তিন বছরে দেশে ভূমিকম্প অনেক বেড়েছে। আবার ১০০ বছরের মধ্যে আমাদের এখানে তেমন বড় ভূমিকম্প হয়নি। এটা আতঙ্কের বিষয়। তার মানে, ছোট এসব কম্পন শক্তি সঞ্চয় করছে। ফলে সামনে বড় ভূমিকম্পের শঙ্কা আছে। রিখটার স্কেলে ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলেও শুধু ভবন ধস নয়, ঢাকার অপরিকল্পিত বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও গ্যাসলাইন এ নগরকে একটি অগ্নিকূপে পরিণত করতে পারে। কয়েক হাজার ভবন ধ্বসে পড়বে। মৃত্যু হতে পারে আড়াই থেকে তিন লাখ মানুষের। কারণ, আমাদের ভবনগুলো এখনও নিরাপদভাবে তৈরি হচ্ছে না।
বুয়েটের বিভিন্ন সময়ে করা জরিপে দেখা যায়, ঢাকায় ১৩ লাখ, চট্টগ্রামে ৩ লাখ ও সিলেটে ১ লাখ বহুতল ভবন রয়েছে। এসব ভবনের ৭৫ শতাংশ হচ্ছে ছয়তলা বা তার চেয়েও উঁচু। ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলে এই ভবনগুলো ও এর বাসিন্দারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। সরকারের সমন্বিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচির সমীক্ষাতেই বলা হয়েছে, ৭ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্প হলে রাজধানীতে প্রায় ৭২ হাজার ভবন ধসে পড়তে পারে।
অধ্যাপক আনসারী বলেন, দ্রুত দেশের ২০ লাখ বহুতল ভবনের সবকটিকে ভূমিকম্প-সহনশীল করতে হবে। সেটা করার মতো কারিগরি দক্ষতা এবং সামর্থ্য বাংলাদেশের আছে। তবে এ জন্য সরকারের জরুরি উদ্যোগ দরকার। সারা দেশে বড় বড় শহরে সিটি করপোরেশনের মাধ্যমে সেখানকার বাসাবাড়ি ভূমিকম্পন-সহনীয় কি না, সেটা যাচাই করতে হবে। কোনো বাসা খারাপ থাকলে মজবুত করার ব্যবস্থা করতে হবে। কারণ, ভূমিকম্পে ৯০ শতাংশ মানুষ মারা যায় ভবন ধসে।
বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক সৈয়দ হুমায়ুন আখতার ডয়চে ভেলেকে বলেন, ঢাকায় যদি সাত মাত্রার ভূমিকম্পও আঘাত হানে, আমাদের যে প্রস্তুতি, ভবনের স্ট্রাকচার, ঘনবসতি তাতে অনেক বড় বিপর্যয় হতে পারে। আমাদের এত বছরে যত উন্নয়নমূলক কাজ হয়েছে তা আবার ফিরিয়ে আনা অনেক সময়-সাপেক্ষ ব্যাপার হবে। ভূতাত্ত্বিক কাঠামো অনুযায়ী বাংলাদেশে তিনটি টেকটনিক প্লেটের সংযোগ স্থলে অবস্থিত। উত্তরে তিব্বত প্লেট, পূর্বে বার্মা সাব-প্লেট এবং পশ্চিমে ইন্ডিয়া প্লেট। এগুলোর বিস্তৃতি সাড়ে তিন হাজার কিলোমিটার। এই জোনে বড় বড় ভূমিকম্প হয়েছে। আবার শতবর্ষে বড় ভূমিকম্প ফিরে আসে।
বেসরকারি সংগঠন ডিজাস্টার ফোরামের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৮ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে বাংলাদেশে ৮৭ বার ভূকম্পন হয়। এ সময় মারা যান ১৫ জন। এর মধ্যে ১৩ জনেরই মৃত্যু আতঙ্কিত হয়ে। প্রাণহানিসহ ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ শহরাঞ্চলেই বেশি। ২০১১ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর সারা দেশে ৬ দশমিক ৯ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়, যার উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকা থেকে ৪৯৬ কিলোমিটার দূরের সিকিম-নেপাল সীমান্তে। ১৮৫৭ সালের পর ঢাকার এত কাছে আর কোনো ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল না।
বাংলাদেশে যদি বড় ধরনের ভূমিকম্পের জন্য উদ্ধার তৎপরতার প্রস্তুতি কেমন? ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সাবেক মহাপরিচালক আলী আহমেদ খান এ প্রসঙ্গে ডয়চে ভেলেকে বলেন, আমাদের খুব বেশি প্রস্তুতি নেই। সবচেয়ে বেশি যেটা জরুরি সমন্বিত উদ্ধার তৎপরতা, যেটার জন্য ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার (এনওইসি) থাকতে হয়। সেটা এখন সময়ের দাবি। তবে সরকার কিছু উদ্যোগ নিয়েছে, সেটা বাস্তবায়ন করা গেলে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। যেমন ড্যাপ বাস্তবায়ন হলে ঢাকা শহরে আর বহুতল ভবন হবে না। পাশাপাশি যে ভবনগুলো আগে হয়েছে, সেগুলোর ভূমিকম্প-সহনশীলতাও পরীক্ষা করে নিশ্চিত করতে হবে।
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, ভেনেজুয়েলার স্থানীয় সময় বুধবার (২৪ জুন) সন্ধ্যা ৬টা ৪ মিনিটে প্রথম কম্পনটি অনুভূত হয়। প্রথম ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল কারাকাসের মন্তালবান এলাকায়, ভূগর্ভের ১৩ দশমিক ২ কিলোমিটার গভীরে। এর মাত্র ৩৯ সেকেন্ডের ব্যবধানে দ্বিতীয় তীব্র কম্পনটি আঘাত হানে। সেটির উৎপত্তিস্থল ছিল ইউমারে অঞ্চল থেকে ২৩ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে এবং গভীরতা ছিল প্রায় ১০ কিলোমিটার।
সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, এই দুর্যোগে ১০ হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা ৪৪ শতাংশ। নিহতের সংখ্যা ১ লাখ ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ৩০ শতাংশ। এছাড়া ভূমিকম্পের পর তীব্র আফটারশক (অনুকম্পন), ভূমিধস ও মাটির তারল্যীকরণের মতো মারাত্মক ঝুঁকির কথা জানানো হয়েছে।
