
শাপলানিউজ.কম
আপডেট : ২০ মে ২০২৬
রাজধানীতে হকার পুনর্বাসনের জন্য বরাদ্দ মার্কেটগুলোর একটি হলো ঢাকা ট্রেড সেন্টার (উত্তর)। সেখানে ১০ দোকান মালিকের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তাদের মাত্র একজন অতীতে হকার ছিলেন। অন্য ৯ জনই দোকান ভাড়া নিয়ে ব্যবসা করছেন। হকার্স নেতাদের দাবি, অন্য মার্কেটগুলোরও একই চিত্র। মাত্র ৫ থেকে ১০ শতাংশ দোকান পেয়েছেন প্রকৃত হকাররা। অন্য দোকানগুলো নানা কৌশলে বাগিয়ে নিয়েছেন সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা, তাদের আত্মীয় কিংবা বড় ব্যবসায়ীরা।
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের মালিকানাধীন ১২৯টি মার্কেট রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ৯১টি এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ৩৮টি। হকারদের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে এসব মার্কেটের বেশির ভাগই বিভিন্ন সময় নির্মাণ করা হয়েছে।
এসব মার্কেটে হকারদের সংখ্যা হাতেগোনা হওয়ার পেছনে একটি বড় কারণ হলো, ফুটপাত ছেড়ে মার্কেটে গেলে বিক্রি কমে যাওয়ার ভয়ে হকাররা সেখানে থাকতে চান না। তারা আবার ফুটপাতে ফিরে আসেন। তা ছাড়া দোকানের বরাদ্দপত্র চড়া দামে বিক্রি করে তারা অধিক মুনাফা লাভ করেন।
মার্কেটগুলোতে কিছু হকার দোকান পেলেও, সেগুলোও এ কারণেই চলে গেছে অন্যদের দখলে। যেসব হকার দোকান বরাদ্দ পেয়েছিলেন, সালামির (মূল্য) অর্থ দিতে না পারায় অনেকেই বরাদ্দপত্রগুলো অন্যদের কাছে বেশি দামে বিক্রি করে দেন। এ কারণে হকারদের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে একের পর এক মার্কেট নির্মাণ করা হলেও, এখন সেখানে প্রকৃত হকারদের সংখ্যা হাতেগোনা।
হকারদের জন্য রাজধানীর গুলিস্তান ও আশপাশের এলাকায় অন্তত ২১টি বহুতল মার্কেট রয়েছে। প্রতিটি মার্কেটেই প্রায় এক হাজার করে দোকান আছে। বেজমেন্টে গাড়ি পার্কিংয়ের স্থানেও দোকান নির্মাণ করে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
গুলিস্তানের ঢাকা ট্রেড সেন্টারের (উত্তর) ১৩৮ নম্বর দোকানের মালিক পিয়ার আহাম্মদ। ইনসাফ ইন্টারপ্রাইজ নামের ওই দোকানে কম্বল, ছাতা, রেইনকোট ও পোশাকসামগ্রী বিক্রি করেন।
গত সোমবার জানতে চাইলে পিয়ার আহাম্মদ বলেন, তিনি ২৫-৩০ বছর আগে গুলিস্তান এলাকায় ফুটপাতে কম্বল বিক্রি করতেন। পরে পোড়া মার্কেটে হকার হিসেবে একটি দোকান পান। দোকানটি পুড়ে যাওয়ার পর এই মার্কেটে এই দোকান বরদ্দ পেয়েছেন। আরেকটি দোকান তিনি আরেকজনের কাছ থেকে কিনে নিয়েছেন। তিনি জানান, এখানে যারা দোকান মালিক, তাদের দুয়েকজন প্রকৃত হকার। অন্যরা দোকান ভাড়া নিয়ে ব্যবসা করছেন।
মার্কেটের জি-১৩৭ নম্বর দোকানের আমানত গার্মেন্টের মালিক মোহাম্মদ মজিদ বলেন, তিনি একজনের কাছ থেকে দোকানটি ভাড়া নিয়েছেন। মাসে ৪০ হাজার টাকা ভাড়া দেন। দোকানটির মালিকের পরিচয় জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেন তিনি। তবে তাঁর দোকানের মালিক কোনো দিন হকার ছিলেন না বলেও জানান।
একই ধরনের কথা বলেন ১৩৫ নম্বর দোকানের ফরায়জী ফ্যাশনের আবুল হোসেন। তিনিও দোকান ভাড়া নিয়ে ব্যবসা করেন। একই কথা বলেন ১৩৬ নম্বর দোকানের সোহাগ এন্টারপ্রাইজের মালিক জাহিদুল ইসলাম। অন্যরাও জানান, তারা কেউ হকার ছিলেন না।
মার্কেট নির্মাণের আগে সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়নি
ডিএসসিসির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা মোবাশ্বের হাসান বলেন, কাঁচাবাজার, মার্কেট প্রভৃতি অবকাঠামো নির্মাণ করে আয় করার ম্যান্ডেট সিটি করপোরেশনের রয়েছে। এখানে হকার পুনর্বাসন করা দ্বিতীয় বিষয়। এখন দেখতে হবে এত এত মার্কেট করে দোকান বরাদ্দ দিয়ে সিটি করপোরেশনের লাভ হচ্ছে কিনা? বিনিয়োগের তুলনায় মুনাফা আসছে কিনা? এর উত্তর হচ্ছে, না।
তিনি বলেন, দেখা যাচ্ছে, একটা মার্কেট নির্মাণের সময় হয়তো প্রতি বর্গফুট ১০ হাজার টাকা সালামি নির্ধারণ করা হচ্ছে। কিন্তু বরাদ্দ দেওয়ার পর দাম বেড়ে যাচ্ছে। তখন বরাদ্দপত্র বিক্রি হয়ে যাচ্ছে চড়া দামে। এ কারণে প্রকৃত হকারের হাতে ওই দোকানটা আর থাকছে না। তৃতীয় পক্ষ দোকানটি নিয়ে নিচ্ছে। সব হিসাব মেলানোর পর দেখা যাচ্ছে, হকার পুনর্বাসনের জন্য সিটি করপোরেশনের মার্কেট নির্মাণের উদ্যোগ লাভজনক হচ্ছে না। এ জন্য মার্কেট নির্মাণের আগে সম্ভাব্যতা যাচাই করতে হবে। কিন্তু সেটা করা হয়নি। আবার এভাবে যদি একের পর এক মার্কেট বানানো চলতে থাকে, তাহলে ঢাকা শহরে শুধু মার্কেটই থাকবে। বসবাসের জন্য আরও যেসব অনুষঙ্গ প্রয়োজন, তা থাকবে না।
রাস্তা-ফুটপাতে হকার, ভোগান্তি নগরবাসীর
রাজধানীর রাস্তা-ফুটপাত হকারদের দখলে চলে যাওয়ায় এর মূল্য দিচ্ছে সাধারণ নগরবাসী। যানজটের কবলে পড়ে অ্যাম্বুলেন্সে রোগী মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। শিক্ষার্থীরা যথাসময়ে স্কুলে যেতে পারছে না। চাকরিজীবীরা নির্দিষ্ট সময়ে কর্মস্থলে পৌঁছাতে পারছেন না। আর ফুটপাতে হেঁটে চলার তো উপায়ই নেই।
ডিএসসিসির সাবেক মেয়র সাঈদ খোকন দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম তিন বছরে কেবল গুলিস্তান এলাকায় ২৮৫ দিন হকার উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছিল। কিছু হকারকে প্রশিক্ষণ দিয়ে বিদেশে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু গুলিস্তানকে হকারমুক্ত করতে পারেননি তিনি। বরং প্রতিবাদে হকাররাই লাঠিসোটা নিয়ে নগর ভবনে হামলা করে। এরপর আর হকার উচ্ছেদের দিকে নজর দেননি সাঈদ খোকন।
ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস মেয়র হওয়ার পর গুলিস্তান এলাকার রাস্তা-ফুটপাতে লাল-হলুদ ও সবুজ রং করে মার্কিং করে দেন। বিভিন্ন এলাকায় ছুটির দিনে ‘হলিডে মার্কেট’ চালুরও নজির আছে। তবে এসব উদ্যোগ নেওয়ার পরও হকার ব্যবস্থাপনা সফল হয়নি। হকারদের সব সময় দাবি ছিল পুনর্বাসন ও আইন প্রণয়ন। সম্প্রতি একটি নীতিমালা করা হলেও, তাতে ঘোর আপত্তি হকার্স সমিতির নেতাদের।
রাজধানীর গুলিস্তানে ফুলবাড়িয়া সুপার মার্কেট-১। গতকাল মঙ্গগবার তোলা ছবি শাপলানিউজ.কম
হকার পুনর্বাসনের গোড়ায় গলদ
বাংলাদেশ হকার্স ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সেকেন্দার হায়াৎ সমকালকে বলেন, যে পদ্ধতিতে সিটি করপোরেশন হকার ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ নেয়, তা কাজে আসবে না। এতগুলো মার্কেট তারা নির্মাণ করল। কিন্তু সেখানে দেখা যায় ৫ থেকে ১০ শতাংশ দোকান হকাররা পেয়েছেন। বাকি দোকানগুলো সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা, তাদের আত্মীয়, বড় ব্যবসায়ীরা নানা কৌশলে নিয়েছেন। এখানে গোড়াতেই গলদ আছে। যত দিন পর্যন্ত প্রকৃত হকারদের তালিকা না হবে এবং হকারদের জন্য একটি গ্রহণযোগ আইন না হবে, ততদিন পর্যন্ত যতই মার্কেট করুক, সমস্যার সমাধান হবে না।
হকার পুনর্বাসনের ধারণা ভ্রান্ত প্রমাণিত
গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান সমকালকে বলেন, মার্কেট বানিয়ে হকারদের পুনর্বাসনের ধারণা ভ্রান্ত বলে প্রমাণিত হয়েছে। একের পর এক মার্কেট নির্মাণ করার কারণে নতুন নতুন হকার ঢাকামুখী হচ্ছেন। তারা মনে করেন, ঢাকায় গেলে ফুটপাতে কিছু নিয়ে বসলেই কিছু আয় করা যাবে। মার্কেটে একটা দোকানও পাওয়া যেতে পারে। সম্প্রতি হকার উচ্ছেদের পর আবার রাস্তা-ফুটপাত মার্ক করে হকারদের বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, এটাও কার্যকর ফল দেবে না। বরং এসব হকারকে কর্মমুখী কারিগরি প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ জনবল হিসেবে গড়ে তোলা দরকার। প্রয়োজনে তাদের বিদেশে পাঠালে সুফল মিলতে পারে। তিনি বলেন, ঢাকায় এত এত মার্কেট হয়ে গেছে, এখন আর মার্কেটের প্রয়োজন নেই।
Kaderabad Housing Mohmmedpur, Dhaka-1207. Phone- 01778840333
Email: m.r.01778840333@gmail.com
Web: www.shaplanews.com
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬