ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষেত্রে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অনেকটাই হুটহাট সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন এবং উপদেষ্টাদের পরামর্শ এড়িয়ে চলছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার ফলে সৃষ্ট জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে তিনি যুদ্ধবিরতির জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধ চলাকালে ট্রাম্প মূলত ইরানের কতগুলো লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস হয়েছে, সেসব কৌশলগত হিসাব নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। ইরানের অভ্যন্তরে বড় কোনও বিস্ফোরণের ফুটেজ দেখতে তিনি পছন্দ করতেন বলে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
ইরানের আকাশসীমায় দুটি মার্কিন বিমান ভূপাতিত হওয়ার খবর জানার পর ট্রাম্প কয়েক ঘণ্টা ধরে তার সহযোগীদের ওপর চিৎকার করেছেন। একজন জ্যেষ্ঠ প্রশাসনিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্টকে সিচুয়েশন রুম থেকে দূরে রাখা হয়েছিল। কারণ তার অস্থিরতা পরিস্থিতির উন্নয়নে কোনও কাজে আসবে না বলে মনে করতেন তারা।
দ্বিতীয় বিমানচালক উদ্ধার হওয়ার পর ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে ধারাবাহিক হুমকি দিতে শুরু করেন। ইস্টার সানডের সকালে অশ্রাব্য ভাষায় তিনি হুমকি দিয়েছিলেন। ওই পোস্টের শেষে তিনি লিখেছিলেন, ‘সকল প্রশংসা আল্লাহর’। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইস্টার ডে-র দিনে প্রেসিডেন্টের মুখে অশ্লীল ভাষা এবং মুসলিম শব্দবন্ধ ব্যবহারের কারণে রিপাবলিকান সিনেটর ও খ্রিস্টান নেতারা হোয়াইট হাউসে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
তবে ট্রাম্প এক উপদেষ্টাকে বলেছিলেন, ইরানকে আলোচনার টেবিলে বাধ্য করতে তিনি নিজেই এই ‘আল্লাহ’ লাইনটি লিখেছিলেন, যাতে তাকে অস্থির ও অনিশ্চিত মনে হয়। কয়েক দিন পর ‘আজ রাতে একটি পুরো সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে’ বলে তিনি যে হুমকি দিয়েছিলেন, সেটিও উপদেষ্টাদের সঙ্গে কোনও সমন্বয় ছাড়াই হুট করে দেওয়া হয়েছিল। ইরানকে ভয় পাইয়ে দিয়ে চুক্তিতে রাজি করানোর জন্যই এটি করা হয়েছিল বলে প্রশাসনিক কর্মকর্তারা জানান।
ট্রাম্পের চুক্তি করার আগ্রহের পেছনে অন্যতম বড় কারণ হলো হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়া। হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা অবাক হয়েছিলেন যে, ইরান কত দ্রুত ও সহজে এই জলপথটি বন্ধ করে দিতে পেরেছে। ট্রাম্প নিজেও অবাক হয়ে বলেছেন, ‘ড্রোন হাতে একজন মানুষ কত সহজে হরমুজ বন্ধ করে দিতে পারে!’। জ্বালানি কোম্পানিগুলোর প্রধান নির্বাহীরা জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট ও অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টকে তাদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। জ্বালানি বাজারের এই অস্থিরতা ট্রাম্পকে মাঝেমধ্যে চাপে রাখলেও, কখনও কখনও তিনি যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার আগ্রহও দেখিয়েছেন।
সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে ট্রাম্পের ঘন ঘন ফোন সাক্ষাৎকার তার প্রেস টিমের সঙ্গে সমন্বয় করা ছিল না। প্রেস টিম তাকে মিডিয়াতে কথা কমানোর পরামর্শ দিলেও তিনি তা শোনেননি। তার উপদেষ্টারা তাকে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেওয়ার পরামর্শ দিলে তিনি তা নিয়ে সন্দিহান ছিলেন। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের মতে, ‘তিনি কী বলবেন? তিনি তো জয় ঘোষণা করতে পারছিলেন না। পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে, তা নিজেও জানতেন না।’ শেষ পর্যন্ত ১ এপ্রিল তিনি ভাষণ দিলেও যুদ্ধ কীভাবে শেষ হবে বা জনসমর্থন বাড়াতে খুব একটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেননি।
ইরানকে আলোচনায় আসার সময়সীমা দেওয়ার পরও ট্রাম্পের মনোযোগ ছিল ইন্ডিয়ানার নির্বাচন, মধ্যবর্তী নির্বাচন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ক্রিপ্টোকারেন্সির দিকে। দূত স্টিভ উইটকফসহ শীর্ষ উপদেষ্টাদের তিনি কেবল ইরানকে চুক্তিতে রাজি করানোর নির্দেশ দিয়েছেন। এ ছাড়া হোয়াইট হাউসের বলরুম সংস্কার এবং আমেরিকার স্বাধীনতার ২৫০তম বার্ষিকী উদযাপনের মতো বিষয়গুলোতে মনোযোগ সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন তিনি।
