
আমাদের কাছে সাধারণ জ্বালানি মনে হলেও বাস্তবে তেলের গুরুত্ব বহুমাত্রিক। তেল শক্তির অন্যতম প্রধান উৎস। আজ বিশ্বজুড়ে যুদ্ধের দামামার মধ্যে তেলের প্রশ্নটি তাই বারবার সামনে আসছে। এর পেছনে যে গভীর কারণ আছে, তা বোঝা কঠিন নয়। মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ দেশই খনিজ তেলে সমৃদ্ধ আর সংঘাতের কেন্দ্রও মূলত এই অঞ্চল। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল, রাশিয়া-ইউক্রেইন কিংবা আফগানিস্তান-পাকিস্তান—এসব যুদ্ধের পেছনে বড় অস্ত্র ব্যবসার স্বার্থও জড়িয়ে আছে। অস্ত্র উৎপাদনকারী দেশগুলোর অর্থনীতির একটি বড় অংশ যুদ্ধনির্ভর। যুদ্ধ শুরু হলেই তাদের মুনাফার সম্ভাবনা বাড়ে; অথচ সাধারণ মানুষতখন মর্মান্তিক বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে।
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পেছনে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অজুহাত দেখালেও প্রকৃত কারণ হলো আধিপত্য ও পরাশক্তির দীর্ঘদিনের ক্ষোভ। ইরানের প্রতিবেশী দেশগুলোর প্রায় সবখানেই মার্কিন ঘাঁটি রয়েছে। আর ইসরায়েল বলা যায় এ অঞ্চল নিয়ন্ত্রণের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্যের মতো।
ইরানের তেহরান, কারাজ ও নাজাফাবাদসহ বিভিন্ন তেল স্থাপনায় হামলা চালানো হয়েছে। রাতের অন্ধকারে আকাশ আগুনে রক্তিম হয়ে উঠেছে। লেলিহান শিখাগুলো ধ্বংসের বার্তা নিয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। ফেটে যাওয়া পাইপলাইনে আগুন ধরে গেছে, আর যতদূর পাইপ গেছে, ততদূর ছড়িয়ে আছে আকাশছোঁয়া দাউদাউ আগুন—মনে হয় যেন আগুনের রাজ্য। ইরানের নাগরিকদের জন্য এটি একধরনের রাসায়নিক যুদ্ধের মতো। নিস্তব্ধ পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত আগুন আর ধ্বংসের নীরব দর্শক সকলেই। কেউ কেউ সমর্থকও। মনে হয় পৃথিবী যেন শুধু ধ্বংসের জন্যই। কালো ধোঁয়ায় দিনের আকাশ ঢেকে গেছে, মেঘের নিচে গাঢ় কালো স্তর। সবার মনে রাজত্ব করছে আতঙ্ক, অগণিত মানুষ হতাহত হচ্ছে।
এই হামলা শুধু ইরানেই সীমাবদ্ধ নেই; ইরান পাল্টা হামলা চালাচ্ছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পরই সৌদি আরবের সবচেয়ে বড় তেল সংস্থা আরামকোর শোধনাগারে হামলা চালায় ইরানের ‘ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর’ (আইআরজিসি)। মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে দু’বার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র আছড়ে পড়ে সেখানে। ফলে তড়িঘড়ি তেল উৎপাদন ও সরবরাহ বন্ধ করতে বাধ্য হয় সৌদি আরব। দ্বিতীয় ধাপে কাতারের তরল প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন কেন্দ্রকে নিশানা করে ইরান। সংঘর্ষ এর পর আরও তীব্র হলে আমিরাতের ফুজাইরাহ তেল শোধনাগার ধ্বংসের চেষ্টা চালায় আইআরজিসি। এই তালিকায় সর্বশেষ নামটি হল বাহরাইন। আত্মঘাতী ড্রোনে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম বড় তেল শোধনাগার বাপকোকে নিশানা করে ইরান। গোটা মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে আগুনের লেলিহান শিখা ছড়িয়ে আছে।
মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতিতে তেলের গুরুত্ব অপরিসীম। হরমুজ প্রণালি ইরানের তীরঘেঁষা হওয়ায় তেলসহ সব আমদানি-রপ্তানিতে ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। বিশ্ব অর্থনীতি টালমাটাল হওয়ার পথে। তেল স্থাপনায় হামলা শুধু অর্থনীতি নয়, পরিবেশ, জীবন ও প্রকৃতির জন্যও ভয়ানক ক্ষতিকর। রাসায়নিকভাবে তেল সাইক্লোঅ্যালকেন; এতে ৯৮.৫ শতাংশ কার্বন ও হাইড্রোজেন থাকে, সামান্য সালফার, নাইট্রোজেন ও অক্সিজেনও। এই সামান্য অংশই পরিবেশ ও জীবনের জন্য বিরাট ক্ষতির কারণ।
তেল পুড়ে তাপ, আলো ও জলীয় বাষ্প ছাড়াও অসম্পূর্ণ দহনে কার্বন মনোক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড ও সালফার অক্সাইড উৎপন্ন হয়। ইরানসহ অন্যান্য দেশের তেল স্থাপনায় হামলায় অসম্পূর্ণ দহন থেকেই আগুনের পাশাপাশি আকাশে কালো স্তর দেখা যাচ্ছে, যা মূলত এই অক্সাইডের ধোঁয়া। এতে অ্যাসিড বৃষ্টির শঙ্কা তৈরি হচ্ছে। অ্যাসিড বৃষ্টিতে হাইড্রোজেন আয়নের ঘনত্ব বেড়ে যায় বা পিএইচ কমে যায়। শিল্প বিপ্লবের পর থেকে বিজ্ঞানীরা এর ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে সতর্ক করে আসছেন। কার্বন, নাইট্রোজেন ও সালফার অক্সাইড নিঃসরণ কমানোর জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। অ্যাসিড বৃষ্টি জলবায়ু পরিবর্তন ও জীববৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে; গাছপালা, জলজ প্রাণী ও অবকাঠামোর ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়ে। বন, মিঠা পানি, মাটি, জীবাণু ও পোকামাকড়ের ব্যাপক ক্ষতি হয়। অবিরাম অ্যাসিড বৃষ্টি গাছের ছাল দুর্বল করে, ফলে খরা, তাপ, ঠান্ডা ও পোকার আক্রমণে গাছ আরও সংবেদনশীল হয়। মাটির গঠন দুর্বল হয়ে ক্যালসিয়াম-ম্যাগনেসিয়ামের মতো পুষ্টি নষ্ট হয়। অবকাঠামোর রং বা ওপরের স্তর ক্ষয় পায়, সেতু-ইস্পাত কাঠামো নষ্ট হয়, পাথরের ভবন ও মূর্তির স্তরও ক্ষয়প্রাপ্ত হয়।
মানুষের স্বাস্থ্যের ওপরও অ্যাসিড বৃষ্টির ভয়ানক প্রভাব রয়েছে। সালফার ও নাইট্রোজেন অক্সাইড ধুলো শ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসে প্রবেশ করলে শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, নিউমোনিয়া ও দীর্ঘস্থায়ী ব্রঙ্কাইটিস সৃষ্টি হয়, যা শিশু ও বৃদ্ধদের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। জলীয় বাষ্পের সংস্পর্শে চোখ, নাক ও গলায় জ্বালাপোড়া তৈরি করে। মাটি ও পানিতে দ্রবীভূত ভারী ধাতু—অ্যালুমিনিয়াম, সীসা, ক্যাডমিয়াম ও পারদ—খাদ্যচক্রে প্রবেশ করে, রক্ত চলাচলে ব্যাঘাত ঘটায় এবং ব্রেন স্ট্রোক, হৃদরোগসহ দীর্ঘস্থায়ী রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
শিল্প বিপ্লবের পর বিংশ শতাব্দীর সত্তরের দশক থেকে নব্বইয়ের দশকে অ্যাসিড বৃষ্টির ক্ষতি মোকাবিলায় বিশ্বনেতৃত্ব ও আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের এনএপিএপি, ক্যাপ অ্যান্ড ট্রেড, ইপিএ ক্লিন এয়ার রুল, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ইউএনইসিই কনভেনশন উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। অথচ সেই যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে তেল স্থাপনায় হামলা অ্যাসিড বৃষ্টির পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। ইরানও প্রতিশোধ স্বরূপ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন মার্কিন ঘাঁটি ও তেল স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। স্থান, সময় ও পরিস্থিতি অনুযায়ী মানুষের প্রতি মূল্যায়নে বিরাট ফারাক রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষা প্রায় নগণ্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। আকাশের কোনো সীমানা নেই; ইরানে অ্যাসিড বৃষ্টি হলেও তার প্রভাব সেখানে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর ভয়াবহতা নির্ণয় ও মোকাবিলায় সক্রিয় পদক্ষেপ জরুরি।
জাতিসংঘের ২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) যেখানে পৃথিবী রক্ষা, শান্তি এবং সমৃদ্ধির জন্য ১৭টি নির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে—যার মধ্যে ১৩ নম্বর লক্ষ্য জলবায়ু সুরক্ষা, ১৬ নম্বর শান্তি ও ন্যায়বিচার এবং ১৭ নম্বর বৈশ্বিক অংশীদারিত্বের কথা বলে—সেখানে বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। আন্তর্জাতিক জলবায়ু সম্মেলনগুলোতে যখন মানবকল্যাণের গালভরা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, তখন রণক্ষেত্রে মিসাইল আর যুদ্ধবিমানের গর্জন ভিন্ন কথা বলছে। বোমায় ব্যবহৃত ভারী ধাতু পরিবেশের যে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করছে, তা বন্ধে কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থার কার্যকর ভূমিকা দৃশ্যমান নয়। আধুনিক সভ্যতার এই ধ্বংসাত্মক আচরণের চরম মূল্য শেষ পর্যন্ত সবাইকেই দিতে হবে।
তথ্যসূত্র: মার্কিন পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থা (ইউএসইপিএ), ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর পিস অ্যান্ড অ্যাপ্লায়েড কেমিস্ট্রি (আইইউপিএসি)
Kaderabad Housing Mohmmedpur, Dhaka-1207. Phone- 01778840333
Email: m.r.01778840333@gmail.com
Web: www.shaplanews.com
Copyright © 2026 Shapla News. All rights reserved.